নিজস্ব প্রতিবেদক :
২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখায় ভুয়া রপ্তানি আদেশ দেখিয়ে প্রায় ১০,৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে—বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্তে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাখাটির ২৯টি গ্রাহক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত রপ্তানির তুলনায় কাগজে-কলমে অনেক বেশি মূল্য দেখিয়ে ১০০ থেকে ৩৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রকৃত রপ্তানি মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এলসি খোলার অনুমতি থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে।
এই অনিয়মের মাধ্যমে আনুমানিক ৯৬৮.১৪ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১০,৪৫৫.৯৫ কোটি টাকা) আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কাঁচামাল আমদানির নামে অর্থ আত্মসাৎ
তদন্তে দেখা গেছে, এলসির বিপরীতে আমদানিকৃত কাঁচামাল রপ্তানিতে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বরং অভিযোগ রয়েছে, এসব পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনাও ধরা পড়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগসাজশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা যথাযথ সতর্কতা (ডিউ ডিলিজেন্স) উপেক্ষা করেছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কোনো তথ্য না দিয়ে বছরের পর বছর এই অনিয়মে সহায়তা করেছেন।
এমনকি একই ব্যবসায়িক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিকভাবে এলসি ব্যবহার করে অর্থ সরানোর প্রক্রিয়াও চিহ্নিত হয়েছে।
ভয়াবহ অসঙ্গতির উদাহরণ
প্রতিবেদনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে—
# টোটাল ফ্যাশন: রপ্তানি ৬২ মিলিয়ন ডলার, এলসি ২৩১ মিলিয়ন
# অবন্তী কালার টেক্স: রপ্তানি ৬৭ মিলিয়ন, এলসি ১৪৬ মিলিয়ন
# ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেল: রপ্তানি ৫৫ মিলিয়ন, এলসি ২০৮ মিলিয়ন
# অহনা নিট কম্পোজিট: রপ্তানি ১৩.৫ মিলিয়ন, এলসি ৯৯ মিলিয়ন
# এইচ কে অ্যাপারেলস: রপ্তানি ৬০.৮৫ মিলিয়ন, এলসি ১২৬ মিলিয়ন
এছাড়াও আরও ২৪টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে।
‘অনেকে জানতেনই না তাদের নামে এলসি খোলা হয়েছে’
একাধিক রপ্তানিকারক অভিযোগ করেছেন, তাদের অজান্তেই তাদের নামে এলসি খোলা হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা রপ্তানি আয় আটকে রেখে জোরপূর্বক ভুয়া কাগজপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পোশাকখাতের ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ হাতেম বলেন,
“ব্যাংক যোগসাজশ করে এসব অনিয়ম করেছে। অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকরা জানতেনই না তাদের নামে এলসি খোলা হয়েছে।”
১০ বছর একই শাখায় ব্যবস্থাপক
অনিয়মের সময় শাখাটির ব্যবস্থাপক ছিলেন মো. শহিদ হাসান মল্লিক, যিনি নিয়ম ভেঙে প্রায় ১০ বছর একই শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া আরও ২৪ জন কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় সেখানে কর্মরত ছিলেন।
বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুর মফিজ জানান, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন এবং পুরো ঘটনায় ফরেনসিক অডিট চলছে।
ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং বিষয়টি দুদকে জানানো হয়েছে।
ব্যবস্থা নিতে ৩ বছরের বিলম্ব
যদিও তদন্ত প্রতিবেদন ২০২৩ সালেই সম্পন্ন হয়, তবুও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে ৩ বছর বিলম্ব হয়।
শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের মার্চে নারায়ণগঞ্জ শাখার অথরাইজড ডিলার (এডি) লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সে সময় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে।
‘শুধু লাইসেন্স বাতিল যথেষ্ট নয়’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেড ফাইন্যান্সে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ঘটে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিবের মতে—
“শুধু লাইসেন্স বাতিল করলেই হবে না। জড়িত সব পক্ষ—ব্যবস্থাপনা, বোর্ড এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।”
সারসংক্ষেপ
প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার এই কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতের তদারকি দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং প্রভাবশালী মহলের প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কঠোর বিচার, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের আর্থিক জালিয়াতি বন্ধ করা যায়।









Discussion about this post