চাকরির আড়ালে সাম্রাজ্য: নারায়ণগঞ্জে প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ গড়ার অভিযোগে তোলপাড়
স্টাফ রিপোর্টার :
সরকারি চাকরি—জনগণের সেবা করার অঙ্গীকার। কিন্তু সেই দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগে একের পর এক আলোচনায় আসছেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। সর্বশেষ এমন অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল, যাদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশ এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারি চাকরির বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে এক শ্রেণির কর্মকর্তা নিজেদের বা পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কাগজে-কলমে মালিক অন্য কেউ হলেও, নিয়ন্ত্রণ থাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার হাতেই। অভিযোগ রয়েছে—দাপ্তরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নামমাত্র মূল্যে জমি কিনে পরে কোটি কোটি টাকায় বিক্রির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত তারা।
এই প্রেক্ষাপটে গাজী মো. মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আরও গুরুতর। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার পর হিসাব জব্দ করেছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে এসেছে এবং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে লেনদেনের মোট পরিমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন এলাকায় ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’ নামে একটি আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, এই প্রকল্পে পুলিশ বাহিনীর কোনো আনুষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
প্রকল্পটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—একজন সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এত বিপুল সম্পদের উৎস কী?
এমন ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও একাধিক সরকারি কর্মকর্তা একই ধরনের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন। করোনাকালে ভুয়া সনদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেপ্তার হওয়া চিকিৎসক সাবরিনা শারমিন হোসেন, আইডিআরএর সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম. মোশাররফ হোসেন কিংবা এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমান—সবার ক্ষেত্রেই সরকারি দায়িত্বের আড়ালে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
আইন অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা ব্যবসায় জড়াতে পারেন না। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে—ক্ষমতা, প্রভাব আর দুর্নীতির জাল ছড়িয়ে অনেকেই হয়ে উঠছেন অপ্রকাশ্য ব্যবসায়ী।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মামুন মাহবুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “সরকারি কর্মকর্তারা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তবে তা শুধু নৈতিক বিচ্যুতি নয়, সরাসরি আইন লঙ্ঘন। ব্যবসা করতে চাইলে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত।”
নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে এমন অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠছে—জনগণের করের টাকায় বেতন নেওয়া কর্মকর্তারা যদি নিজেরাই অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে কে?
এখন দেখার বিষয়—অভিযোগের এই পাহাড় কি তদন্তের মধ্যেই চাপা পড়ে যাবে, নাকি আইনের কঠোর প্রয়োগে প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হবে। কারণ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এমন অপকর্ম থামবে না—বরং আরও বিস্তার লাভ করবে।









Discussion about this post