খুঁটিতে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা: ‘ইমাম’ পরিচয়ের আড়ালে নির্মমতা, মাইকে উল্লাস—আইনশৃঙ্খলা কোথায় ?
নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় এক ভয়াবহ ও মধ্যযুগীয় বর্বরতার ঘটনা আবারও প্রমাণ করল—আইনের শাসন ভেঙে পড়লে কীভাবে একদল উন্মত্ত মানুষ নিজেরাই বিচারক-জল্লাদে পরিণত হয়।
ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে সিজান (২৫) নামে এক যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতনের পর পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর এই নৃশংসতার পর মাইকে ঘোষণা দিয়ে নিহতকে ‘কুত্তা’ বলে গালাগাল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবমাননার দুঃসাহস দেখানো হয়েছে—যা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, রাষ্ট্রের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম পরিচয়ধারী মাসদাইর শ্মশানের হিরোইঞ্চি আক্তারের পুত্র কাউছার আহমেদ কাশেমী, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী জিলানী ও তার পুত্রসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত।
তারা শুধু হত্যাই করেনি, বরং পরে থানায় গিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করার দুঃসাহস দেখিয়েছে—যেন অপরাধ নয়, বীরত্বের প্রদর্শনী !
ব্যাপক সমালোচনা ও জোড়ালো তদ্বিরের পরও এ ঘটনায় নিহত সিজানের মা শিল্পী বেগম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
মামলায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৪-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—হিরোইঞ্চি আক্তার পুত্র কাউছার আহমেদ কাশেমী, আব্দুল গনি হুজুর, আজহার, সাইদুল, আলম ও জিলানী ফকির।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৪ জুলাই বিকেলে মোবাইল চুরির সন্দেহে অনিক নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে সিজানের নাম বললে, আল ফালাহ সমাজকল্যাণ সংঘের সদস্যরা তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়।
এরপর খলিলের মোড়ে এনে সিজান ও অনিককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে চোখ-মুখ ঢেকে স্টিলের পাইপ দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। এই বর্বরতায় সিজানের পায়ের হাড় ভেঙে যায় এবং শরীর জুড়ে গুরুতর জখম হয়।
সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয়—এই নির্যাতনের সময় কিংবা পরে কেউ আইনের আশ্রয় না নিয়ে উল্টো উল্লাসে মেতে ওঠে। সন্ধ্যার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় সূত্র বলছে, ঘটনার পরপরই একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা চালায়। একইসঙ্গে মামলা দায়েরের আগেই মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে নিহতের পরিবারকে চুপ করানোর অপচেষ্টা চালানো হয়।
তবে পরিবারের দৃঢ় অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
প্রশ্ন উঠেছে—একজন মানুষ যদি অতীতে ভুল করে থাকেও, তাকে কি এইভাবে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার লাইসেন্স কেউ পেয়েছে ? একজন ইমাম পরিচয়ধারী ব্যক্তি কীভাবে এমন বর্বরতার নেতৃত্ব দেয় ? আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে এমন ঘটনাগুলো বারবার ঘটছে কেন ?
একই সাথে মাইকে ঘোষণা দিয়ে নিহতকে ‘কুত্তা’ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘কুত্তা বাহিনী’ বলে আখ্যায়িত করার দুঃসাহস দেখানো কোথা থেকে ?
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মাহাবুবুর আলম জানিয়েছেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—গ্রেপ্তারই কি যথেষ্ট, নাকি এই ধরনের ‘গণবিচার’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি?
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন সিজানের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—আইন কতটা শক্ত হাতে এই বর্বরতার জবাব দেয়।









Discussion about this post