রক্তের দামে দরদাম ! ফতুল্লায় কিশোর নিহতের ঘটনায় ‘ধামাচাপা সিন্ডিকেট’ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
একটি কিশোরের নিথর দেহ, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে টাকার দরদাম—এ দৃশ্য কি কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় ?
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় ১৫ বছরের মাদ্রাসাছাত্র হাবিব হাসানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—বরং পুরো ব্যবস্থার বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই ২০২৬) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফতুল্লার পূর্ব গোপালনগর বক্তাবলী ফেরীঘাট এলাকায় ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাবিব তার বাবার আখের রসের দোকানে বসে ছিল। ঠিক সেই সময় শাহ সিমেন্ট কোম্পানির একটি বেপরোয়া কাভার্ড ভ্যান (ঢাকা মেট্রো-উ-১১-১৫০৮) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে একটি ট্রাককে ধাক্কা দেয়, পরে সরাসরি দোকানের ওপর উঠে পড়ে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় হাবিব।
এখানেই শেষ নয়—বরং এখান থেকেই শুরু বিতর্কের।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পরপরই ‘মাছের বাজারের মতো’ দরদাম শুরু হয়। কখনো ২০ হাজার, কখনো ৩০ হাজার, কখনো ৫০ হাজার—এভাবে বাড়তে বাড়তে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, এই দরকষাকষিতে সরাসরি জড়িত ছিলেন সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কিছু কর্মকর্তা ও তাদের নিয়োজিত দালালরা।
প্রশ্ন উঠছে—একটি প্রাণের মূল্য কি তাহলে টাকার অঙ্কে নির্ধারিত হবে ?
স্থানীয়রা জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, বড় কোম্পানির গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটালে থানা ও আদালত চত্বরে বসেই ‘সমঝোতা বাণিজ্য’ চালানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে এমন দরকষাকষি যেন এক নীরব সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি এ কাজের জন্য বেতনভুক্ত লোক নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
দুর্ঘটনার পর জনতা চালক মনির (২৮) ও হেলপার শাহাদাৎ হোসেন (৪০)-কে আটক করে। পরে পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয় এবং গাড়িটি জব্দ করে।
বুধবার (২৯ জুলাই) নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাইফুল ইসলামের আদালতে তোলা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
নিহতের পরিবার ইতোমধ্যে ফতুল্লা থানায় মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে—তদন্ত কি সত্যিই নিরপেক্ষ হবে, নাকি টাকার চাপে ভিন্ন খাতে মোড় নেবে ?
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এটি আর শুধু সড়ক দুর্ঘটনার মামলা নয়; এটি একটি ‘পরীক্ষা’—আইন, বিচার এবং প্রশাসনের সততার পরীক্ষা। যদি একটি কিশোরের রক্তের মূল্য টেবিলে বসে দরদাম করে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের আশা কোথায় দাঁড়াবে ?
এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এলেও ক্ষোভ আরও তীব্র।
সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় যেন এই ঘটনা চাপা না পড়ে। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং অভিযোগ ওঠা ‘ধামাচাপা সিন্ডিকেট’-এর বিরুদ্ধেও অবিলম্বে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত চালাতে হবে।
হাবিবের মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি পুরো সমাজের বিবেকের পরীক্ষা।









Discussion about this post