নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বাজেট: ‘হাজার কোটির’ প্রত্যাশা, বাস্তবায়ন কতটা ?
নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাত পোহালেই আজ (৩০ জুলাই, বৃহস্পতিবার) ঘোষণা হতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট।
সম্ভাব্য এই বাজেটের আকার প্রায় হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে বাজেটের পরিমাণ বাড়লেও বাস্তবায়ন ও সেবার মান নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে রয়েছে প্রশ্ন ও প্রত্যাশার মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
বাজেটের আকারে বড় লাফ
গত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে নাসিকের বাজেট ছিল ৭৭৫ কোটি ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৫৮ টাকা। সে হিসেবে নতুন অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেগা প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাজেটের আকার বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
নাসিকের বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় নগর ভবনের অডিটরিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাজেট ঘোষণা করবেন।
আয়-ব্যয়ের বাস্তবতা
গত অর্থবছরে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে আয় ধরা হয়েছিল ৭৭৫ কোটি টাকার বেশি, আর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭৮ কোটি টাকার কিছু বেশি। বছর শেষে প্রায় ৯৬ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত থাকার কথা বলা হলেও, বাস্তবায়নের হার ও প্রকল্প অগ্রগতি নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটের আকার যত বড়ই হোক, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
অগ্রাধিকার খাত: পুরনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি?
নতুন বাজেটে যেসব খাতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে—
- রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ
- জলাবদ্ধতা নিরসন
- পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন
- মশক নিধন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ
- পরিবেশ দূষণ রোধ
- যানজট নিরসন
- সড়ক বাতির উন্নয়ন
- স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাত
তবে নগরবাসীর অভিযোগ—এগুলো প্রতি বছরই অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, বাস্তবে অনেক প্রকল্পই দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে থাকে বা মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হয় না।
পানির প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ
বিদেশি সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের আওতায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে—
- ২০ কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইন
- ৩০০ কিলোমিটার বিতরণ পাইপলাইন
- ৩৫ হাজার হোল্ডিংয়ে পানি সংযোগ ও স্মার্ট মিটার
- ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ
এছাড়া ৫ হেক্টর জমিতে পার্ক, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার ও গণপরিসর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাস্তব চিত্র: সেবা বনাম পরিকল্পনা
নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ—
- বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা
- অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
- খাল ও পুকুর দখল
- সড়কের বেহাল দশা
- ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা
এসব সমস্যার সমাধান কতটা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বাজেট ঘোষণার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে মনিটরিং, জনসম্পৃক্ততা এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ জরুরি। না হলে বড় বাজেটও নাগরিক সেবায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হতে পারে।
প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই বাজেট নারায়ণগঞ্জের জন্য একটি সুযোগ—
যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন হয়, তাহলে নগরীর অবকাঠামো, পরিবেশ ও জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব।
কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক তদারকি ছাড়া বড় বাজেটও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।
এখন দেখার বিষয়—‘হাজার কোটির বাজেট’ কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তবেই বদলে দেয় নারায়ণগঞ্জ শহরের চিত্র।









Discussion about this post