ফতুল্লায় বন্ধ গোডাউনে গলিত লাশ উদ্ধার: চুরির বিরোধে হত্যার আশঙ্কা, আটক ২
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা একটি গোডাউনের ভেতর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির গলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় চুরির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুজনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি, লাশ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চুরি চক্রের দ্বন্দ্ব ও সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে ফতুল্লার কুতুবাইল এলাকার ‘প্যারাডাইস কেবলস লিমিটেড’-এর একটি পরিত্যক্ত গোডাউন থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, দুপুর পৌনে ১টার দিকে বন্ধ গোডাউন থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শহিদুল ইসলাম সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে গোডাউনের ভেতর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির গলিত লাশ উদ্ধার করেন।
পুলিশ জানায়, লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই)-এর ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে কাজ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ১০ থেকে ১৫ দিন আগে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এটি হত্যাকাণ্ড কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। লাশটি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে চুরির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পারভেজ (২৫) ও পিয়াস (৩০) নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তাদের বাড়ি যথাক্রমে ময়মনসিংহের গফরগাঁও এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এলাকায়।
চুরি চক্র ও দ্বন্দ্বের অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা প্যারাডাইস কেবলসের গোডাউনকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র সক্রিয় ছিল। তারা নিয়মিতভাবে ভেতরে ঢুকে মূল্যবান মালামাল চুরি করে আসছিল।
সূত্রগুলো আরও জানায়, এই চক্রের নিয়ন্ত্রণ ও চুরি করা মালামালের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দুটি গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। একটি পক্ষের নেতৃত্বে ছিল স্থানীয় এক কুখ্যাত অপরাধীর আত্মীয় রবিন, অপরপক্ষে ছিল মাহবুব গ্রুপ। ধারণা করা হচ্ছে, এই দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষে ওই অজ্ঞাত যুবক নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সব দিক বিবেচনায় রেখে ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান নিয়ে নানা অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের চার ভাই—মোবারক, মোশারফ, মজিবর ও মনিয়ার—দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে নকল বৈদ্যুতিক তার তৈরির ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
সূত্রগুলো জানায়, পুরান ঢাকায় একটি সাধারণ তারের দোকান (বিদ্যুৎ ইলেক্ট্রনিক) থেকে ব্যবসা শুরু করা মোবারক মোশারফ পরবর্তীতে সরকারি প্রতিষ্ঠান “স্টার্ন কেবলস”-এর নাম ও লোগো স্টিকার ব্যবহার করে নকল তার উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেন। এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে নারায়ণগঞ্জে “প্যারাডাইস কেবল” নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুরে একটি স্পিনিং মিলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ২৫শ’ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশে প্যারাডাইস কেবলসহ চাষাড়ায় প্যারাডাইস ভবন, স্পিনিং মিল, বাড়ি ও গাড়ি রেখে তারা আত্মগোপনে চলে যান।
এ ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও এখনো পর্যন্ত অভিযুক্ত চার ভাইকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মোবারক দেশে অবস্থান করলেও বনানী, গুলশান ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় নিয়মিত মোটা অঙ্কের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে গ্রেফতার এড়িয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, প্যারাডাইস কেবলসের কর্ণধারদের পলাতক অবস্থার সুযোগ নিয়ে ফতুল্লার একটি চক্র প্রতিষ্ঠানটির মূল্যবান মালামাল চুরিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
স্থানীয়ভাবে পরিচিত নিহত রহমতের ভাতিজা রবিন ও তার প্রতিপক্ষ মাহাবুব গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে এই চুরির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিদিন রাতে সংগঠিত এই চুরির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। এর জের ধরে সংঘর্ষে এক যুবক নিহত হন।
তদন্ত চলছে
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের পরিচয় শনাক্ত, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে। আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।









Discussion about this post