আদালত প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
“দশ মাসে আমার চোখে পাঁচটি অপারেশন হয়েছে। এখনো চোখ, মাথা ও সারা শরীরে প্রায় ৪০টি স্প্লিন্টার রয়েছে। আমাকে জানিয়েছে, আমার চোখ আর ভালো হবে না; বরং দিন দিন অবনতি হবে।”
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আহত সম্রাট হোসেন।
বুধবার (১২ আগস্ট) তিনি ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে সম্রাট হোসেন নিজেকে মোটর শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গার্মেন্টস পণ্য পরিবহনের গাড়ি চালাতেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে ১৯ জুলাই কোনো কাজ না থাকায় তিনি আন্দোলনে যোগ দেন।
সম্রাটের দাবি, ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে আন্দোলনস্থলে তিনি তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান এবং একজন সাংবাদিককে দেখতে পান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আরও অনেক নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র ব্যক্তিরা এলোপাতাড়ি গুলি চালালে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গুলিতে তার চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়।
সম্রাট বলেন, একই সময় তার সহযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেনের শরীরে শতাধিক পিলেট বিদ্ধ হয়। আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর কয়েক মিনিট তিনি জ্ঞান হারান। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান, তার ছোট ভাই মিল্লাত হোসেন এবং স্থানীয় আহম্মেদ নামে আরেক ব্যক্তি তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন।
প্রথমে তাকে খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সম্রাটের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই রাতেই তার শরীর ও দুই চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। ঢাকা মেডিকেলে তিন দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে প্রায় ১০ মাস চিকিৎসাধীন থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সময় তার চোখে পাঁচবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এত চিকিৎসার পরও তার চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪০টি স্প্লিন্টার রয়ে গেছে।
চোখের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিকিৎসকদের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক কোনো কথা পাননি বলে জানান সম্রাট। তার ভাষায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছে—তার চোখ আর ভালো হবে না; বরং সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
জবানবন্দিতে এ ঘটনার জন্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, সাংবাদিক রাজু আহমেদসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের আরও অনেক নেতাকর্মীকে দায়ী করেন সম্রাট।
মামলায় তিন অভিযোগ
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থান দমনে নারায়ণগঞ্জে অস্ত্র হাতে নিয়ে হত্যাকাণ্ড চালানোর সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ আসামিরা জড়িত ছিলেন। প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলন দমনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নারায়ণগঞ্জে সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ড ও আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল ও ছয় বছরের শিশু রিয়াসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২১ জুলাই ফতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যা করা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুমতি নিয়ে শামীম ওসমান তার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে এসব হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন।
মামলায় শামীম ওসমানের পাশাপাশি তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। মামলার আসামিরা সবাই পলাতক রয়েছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
সম্রাট হোসেনের এই জবানবন্দিতে ১৯ জুলাইয়ের সহিংসতার সময় তার ব্যক্তিগত ক্ষত, দীর্ঘ চিকিৎসা এবং স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো বিচারাধীন; সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আসামিপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।









Discussion about this post