গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জ: ৬১ হাজার কোটি টাকার মেট্রো লাইন-২, লক্ষ্য ২০৩০
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
ঢাকার গাবতলী থেকে পুরান ঢাকার ব্যস্ত জনপদ পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত নতুন মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
‘এমআরটি (ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট) লাইন-২’ নামে প্রস্তাবিত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে ২৪টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাতাল ও উড়াল—দুই ধরনের অবকাঠামোর সমন্বয়ে নির্মিতব্য মেট্রোরেলটি ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এবারের প্রস্তাবিত রুটে সরাসরি নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গাবতলী, কমলাপুর ও সাইনবোর্ড এলাকায় অন্যান্য মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুলাই প্রকল্পটির প্রাক-প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব বা পিডিপিপি নীতিগত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের যাচাই-বাছাই শেষে বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানোর কথা রয়েছে।
৩৫ কিলোমিটার রুট, ২৪ স্টেশনের পরিকল্পনা
বর্তমান প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রো লাইন-২ গাবতলী থেকে শুরু হয়ে ঢাকা উদ্যান, বছিলা মোড়, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাপ্তানবাজার ও ডেমরা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত পৌঁছাবে।
তবে প্রকল্পের মোট ২৪টি স্টেশনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও চূড়ান্ত অবস্থান এখনো প্রাক-প্রকল্প পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের অংশ। রুটটি কোথায় পাতাল এবং কোথায় উড়ালপথে যাবে, সেটিও চূড়ান্ত সমীক্ষা, নকশা ও প্রকৌশল পরিকল্পনার পর নির্ধারিত হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় গুলিস্তান থেকে নয়াবাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রুট—পরিকল্পনায় নতুন মোড়
এমআরটি লাইন-২ নিয়ে পরিকল্পনা নতুন নয়। সরকারি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার আগের নথিতে এমআরটি লাইন-২-এর একটি দীর্ঘমেয়াদি করিডর গাবতলী থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকা হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত বিবেচনায় ছিল। একই পরিকল্পনায় কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ করিডরের জন্য আলাদা এমআরটি লাইন-৪-এর কথাও ছিল।
পরবর্তী সময়ে সরকার এমআরটি লাইন-২-এর সম্ভাব্য রুট নিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করে। ২০২৩ সালের সরকারি পরিকল্পনার নথিতে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ রুট এবং সদরঘাটমুখী একটি শাখা লাইনের জন্য উন্নয়ন সহযোগী খোঁজার কথা উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার ধারণাটি কয়েক বছর ধরে পরিকল্পনায় থাকলেও সাম্প্রতিক পিডিপিপিতে তারাবো পর্যন্ত নতুন রুট বিন্যাস আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও গাবতলী-ডেমরা করিডরে এমআরটি লাইন-২-এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা, অর্থায়ন কাঠামো ও দরপত্রসংক্রান্ত কাজ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়। সে সময় প্রকল্পটি মূলত গাবতলী-ডেমরা রুটকে কেন্দ্র করে আলোচনায় ছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে নতুন প্রস্তাবে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত রুট সম্প্রসারণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
মাঝপথে স্থগিত, আবার নতুন করে অগ্রগতি
প্রকল্পটির অগ্রযাত্রা অবশ্য একটানা ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত বছরের ৮ অক্টোবর রুট বিন্যাস নীতিগত অনুমোদনের জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত রাখার মত দেয়।
তখন নতুন কোনো মেট্রোরেল প্রকল্পে যাওয়ার আগে ঢাকার পুরো মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার মেট্রোরেলের বিভিন্ন প্রকল্প আবার এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার প্রকল্প, বড় অর্থায়ন বিদেশি ঋণে
প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বড় অংশ বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তা থেকে পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক—এআইআইবির সঙ্গেও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটি এখনো অনুমোদিত মূল উন্নয়ন প্রকল্প নয়। পিডিপিপি যাচাই-বাছাই, বৈদেশিক অর্থায়নের নিশ্চয়তা, সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা এবং পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় ও অর্থায়নের কাঠামো নির্ধারিত হবে। তাই বর্তমান ব্যয় ও ঋণ সহায়তার অঙ্কগুলোকে প্রস্তাবিত হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের আগ্রহ, তবে চূড়ান্ত চুক্তি এখনো বাকি
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-২-এ ঋণ সহায়তার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের নীতিগত আগ্রহ রয়েছে। এর আগে প্রাথমিক সমীক্ষার জন্যও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের আগ্রহের কথা উঠে এসেছিল। তবে নতুন রুট, সংশোধিত প্রকল্প কাঠামো ও বৈদেশিক অর্থায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগে ঋণের পরিমাণ ও শর্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হবে না।
এআইআইবির সঙ্গেও ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে অনুসন্ধানে এআইআইবির প্রকাশ্য প্রকল্প তালিকায় এখন পর্যন্ত এমআরটি লাইন-২ নামে অনুমোদিত কোনো প্রকল্প পাওয়া যায়নি। ফলে এআইআইবির অর্থায়নকে এখনো আলোচনাধীন বা প্রস্তাবিত পর্যায় হিসেবেই দেখা হচ্ছে; চূড়ান্ত ঋণচুক্তি হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্য নথিতে পাওয়া যায়নি।
অন্যান্য মেট্রোলাইনের সঙ্গে বড় সংযোগ
প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২ শুধু গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি পৃথক রেলপথ নয়; একে ঢাকার ভবিষ্যৎ সমন্বিত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- গাবতলী এলাকায় এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের সঙ্গে সংযোগের পরিকল্পনা রয়েছে।
- কমলাপুর এলাকায় এমআরটি লাইন-১, লাইন-৪ ও লাইন-৬-এর সঙ্গে আন্তঃসংযোগের পরিকল্পনা রয়েছে।
- সাইনবোর্ড এলাকায় এমআরটি লাইন-৪-এর সঙ্গে সংযোগের কথা বলা হয়েছে।
এ সংযোগগুলো বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের যাত্রীরা একাধিক মেট্রোলাইনে পরিবর্তন করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ পেতে পারেন।
তারাবো থেকে কি একদিন মুন্সীগঞ্জেও যাবে মেট্রো ?
বর্তমান পরিকল্পনায় মেট্রো লাইন-২-এর গন্তব্য নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত। তবে পরবর্তী সময়ে এ রুট মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। এটি এখনো দীর্ঘমেয়াদি ধারণা পর্যায়ে রয়েছে। তারাবো পর্যন্ত মূল প্রকল্পের সমীক্ষা ও নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা নিয়ে পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ?
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা করিডর দেশের অন্যতম ব্যস্ত যাতায়াত ও বাণিজ্যিক করিডর। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা, ব্যবসা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার মধ্যে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে ডেমরা, সাইনবোর্ড, কাঁচপুর ও আশপাশের এলাকায় সড়কনির্ভর যাতায়াত দীর্ঘদিন ধরেই যানজটের চাপের মধ্যে রয়েছে।
নতুন মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সরাসরি দ্রুতগামী গণপরিবহন সংযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, আজিমপুর, নিউমার্কেট ও সায়েন্স ল্যাবের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোকে একই রুটে আনার পরিকল্পনা এ প্রকল্পকে অন্য মেট্রোলাইনের তুলনায় আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত সুফল নির্ভর করবে স্টেশনের প্রকৃত অবস্থান, আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা, যাত্রী ধারণক্ষমতা, ভাড়া, নির্মাণকালীন যানজট ব্যবস্থাপনা এবং নারায়ণগঞ্জ অংশে শেষ পর্যন্ত রুটটি কোথায় গিয়ে থামবে—এসব বিষয়ের ওপর।
২০৩০ সালের লক্ষ্য—কতটা বাস্তবসম্মত ?
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে প্রকল্পের কাজ শুরু করে ২০৩০ সালের মধ্যে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো পিডিপিপি যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। এর পর রয়েছে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, সমীক্ষা, বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা, ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলে সেই প্রক্রিয়া, পরিবেশগত মূল্যায়ন, দরপত্র ও নির্মাণকাজ।
অর্থাৎ ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে পরবর্তী কয়েক বছরে এসব ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। প্রকল্পটি ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং পাতাল ও উড়াল—দুই ধরনের অবকাঠামো নিয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় প্রকৌশল ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার জটিলতাও কম নয়।
পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের অপেক্ষা
সব মিলিয়ে এমআরটি লাইন-২ এখনো মূলত পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। তবে গাবতলী-ডেমরা করিডরের ধারণা থেকে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত রুট অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রকল্পটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়ন আলোচনা, পরিকল্পনা কমিশনে পিডিপিপি পাঠানো এবং অন্যান্য মেট্রোলাইনের সঙ্গে সংযোগের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পরিকল্পনার নকশায় থাকা এই মেট্রোরেল কবে বাস্তবে রূপ নেবে এবং তারাবো পর্যন্ত ঘোষিত রুট শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদন পায় কি না।
পিডিপিপি অনুমোদন, বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া এবং পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রুট, স্টেশন, ব্যয় ও বাস্তবায়ন সময়সূচিতে পরিবর্তনের সুযোগ থাকছে। তাই ২০৩০ সালে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য আপাতত সরকারের পরিকল্পনা হলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নির্ভর করবে আগামী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থায়ন সিদ্ধান্তের ওপর।









Discussion about this post