ফুলবাড়ীর ২০ বছর পরও এশিয়া এনার্জি প্রশ্নে ক্ষোভ
রফিউর রাব্বির হুঁশিয়ারি: ‘দিনাজপুরে হাত দিলে পরিণতি সুখকর হবে না’
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্পকে ঘিরে দুই দশক আগের রক্তাক্ত আন্দোলনের স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। সেই আন্দোলনের ২০ বছর পূর্তিতে আবারও সামনে এসেছে বহুল বিতর্কিত উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রশ্ন। এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এখনো ফুলবাড়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে—এমন প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেল ৫টায় ফুলবাড়ী আন্দোলনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি বলেন, অতীতে জনরোষের মুখে ফুলবাড়ীর কয়লা নিয়ে এশিয়া এনার্জির পরিকল্পনা টিকতে পারেনি। এখন প্রতিষ্ঠানটি ভিন্ন নামে আবারও ফিরে আসার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রফিউর রাব্বি বলেন, “চুক্তিতে বলা হয়েছিল উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সেখান থেকে কয়লা উত্তোলন করা হবে। এর ফলে ওই এলাকার প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস হতো। তবে তার চেয়েও আত্মঘাতী বিষয় হলো, উত্তোলিত কয়লার ৯৪ শতাংশ তারা নেবে, আর বাংলাদেশ পাবে মাত্র ৬ শতাংশ।”
তবে এ প্রসঙ্গে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ৯৪ ও ৬ শতাংশের হিসাবটি ফুলবাড়ী প্রকল্পবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অন্যতম অভিযোগ ও প্রচারিত প্রস্তাবিত বণ্টন কাঠামোর অংশ। ফুলবাড়ী আন্দোলনের ২০ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় উত্তোলিত কয়লার ৬ শতাংশ বাংলাদেশ পাওয়ার কথা ছিল এবং ৯৪ শতাংশ এশিয়া এনার্জির নিয়ন্ত্রণে থাকত, যার বড় অংশ রপ্তানির পরিকল্পনা ছিল।
এশিয়া এনার্জি কি সত্যিই ‘ফিরে এসেছে’?
ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের সঙ্গে এশিয়া এনার্জির সম্পর্ক নতুন নয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক GCM Resources PLC-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রতিষ্ঠানটি পূর্বে Asia Energy PLC নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯৮ সালে GCM-এর সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান Asia Energy Corporation (Bangladesh) Pty Limited ফুলবাড়ী এলাকায় অনুসন্ধান ও খনি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়। GCM-এর নিজস্ব তথ্য বলছে, ফুলবাড়ী কয়লা ও বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তারা এখনো বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
অর্থাৎ, রফিউর রাব্বির “ভিন্ন নামে ফিরে এসেছে” বক্তব্যের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে এই অর্থে যে, Asia Energy PLC-এর করপোরেট পরিচয় পরিবর্তিত হয়ে GCM Resources PLC হয়েছে। তবে কোম্পানির নিজস্ব নথিতে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান Asia Energy Corporation এখনো ফুলবাড়ী প্রকল্পের লাইসেন্সধারী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
GCM-এর ওয়েবসাইটে ফুলবাড়ীর প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা সম্পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কয়লা উন্মুক্ত বা ওপেন-কাট পদ্ধতিতে উত্তোলনের উপযোগী। প্রকল্পের সম্ভাব্য খনি এলাকার বড় অংশই কৃষিজমি বলেও তাদের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণেই পরিবেশ, কৃষি, পানি ও জনবসতি নিয়ে প্রকল্পটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে কোম্পানির দাবি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের ভিত্তিতেই প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এটি দেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
‘সরকারকে বলব, দিনাজপুরে হাত দেবেন না’
সমাবেশে রফিউর রাব্বি সরকারের প্রতি কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন, “এই শিক্ষা ২০ বছর আগে আপনাদের হয়েছিল। দিনাজপুরে হাত দিলে এর পরিণতি খুব সুখকর হবে না। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী থেকে কয়লা উত্তোলন বন্ধ করেন।”
তিনি অভিযোগ করেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জানে বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব। এ কারণেই জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা বারবার ফিরে আসে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও তীব্র সমালোচনা
সমাবেশে রফিউর রাব্বি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিরও কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি একে “আত্মঘাতী” ও “দেশের স্বার্থবিরোধী” আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সরকারি ও আনুষ্ঠানিক নথিতে পাওয়া তথ্য কিছু ক্ষেত্রে তার বক্তব্যের সঙ্গে মিললেও কয়েকটি দাবির ভাষা ও ব্যাখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (USTR) জানিয়েছে, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘Agreement on Reciprocal Trade’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে জ্বালানি পণ্য, সয়াপণ্য, দুগ্ধ, গরুর মাংস, পোলট্রি, যন্ত্রপাতি, যানবাহন ও অন্যান্য পণ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে।
USTR-এর ফ্যাক্টশিটে কৃষি খাতে গম, সয়া ও সয়াপণ্য এবং তুলা কেনার বাণিজ্যিক সমঝোতার আনুমানিক মোট মূল্য ৩৫০ কোটি ডলার বলা হয়েছে।
চুক্তির প্রকাশিত পাঠের একটি কপিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ বছরে অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম পাঁচ বছর কেনার উদ্যোগ নেবে বা বাংলাদেশি কোম্পানির মাধ্যমে তা কেনায় সহায়তা করবে। একই নথিতে এক বছরের জন্য সয়া ও সয়াপণ্য কেনার ক্ষেত্রে ১২৫ কোটি ডলার অথবা ২৬ লাখ মেট্রিক টন—যেটি কম—সেই পরিমাণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ১৫ বছরে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি কেনা বা দীর্ঘমেয়াদি অফটেক চুক্তিতে সহায়তার কথাও রয়েছে।
তবে রফিউর রাব্বির বক্তব্যে চুক্তির যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে—“আমেরিকাকে না জানিয়ে অন্য কোনো জায়গা থেকে কিছু কেনা যাবে না”—এমন সরাসরি ও সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার ভাষা USTR-এর প্রকাশিত ফ্যাক্টশিটে পাওয়া যায়নি। একইভাবে সব ধরনের জ্বালানি, বিমান বা সামরিক সরঞ্জাম শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কিনতে হবে—এমন সর্বব্যাপী বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও চুক্তির প্রকাশিত সারসংক্ষেপে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। বরং প্রকাশিত নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কেনা বাড়ানো এবং মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনা বৃদ্ধি ও নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
আদালতের রায় ও মালয়েশিয়া প্রসঙ্গ
রফিউর রাব্বি তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি নিয়ে আপত্তি ওঠার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু ব্যাপকভিত্তিক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি বিতর্ক ও আদালতের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্দিষ্ট চুক্তিকে কোনো মার্কিন আদালত বাতিল করেছে বা মালয়েশিয়া একই ধরনের চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং USTR-এর বর্তমান তালিকায় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া—উভয় দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
‘চুক্তি সংসদে আলোচনা হয়নি’—রাজনৈতিক প্রশ্ন
রফিউর রাব্বি বলেন, এত বড় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। তিনি বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর রাজনীতির অভিযোগ তোলেন।
তার ভাষায়, “এতবড় একটা আত্মঘাতী চুক্তি, যা নিয়ে বিদেশে পর্যন্ত আলোচনা হচ্ছে, সংসদে একটিবারও এই চুক্তিটা নিয়ে তারা কথা বলার প্রয়োজন মনে করেনি।”
তিনি বলেন, “আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। জনগণকে বাদ দিয়ে বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না।”
‘বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার প্রমাণ দেখতে চাই’
সমাবেশের শেষ দিকে রফিউর রাব্বি বলেন, সরকার মুখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর কথা বললেও বাস্তবে দেশের জ্বালানি, খনিজসম্পদ ও বাণিজ্যনীতিতে সেই অগ্রাধিকার কতটা দেওয়া হচ্ছে, তার প্রমাণ দেখতে চান তারা।
তার দাবি, ফুলবাড়ীর উন্মুক্ত খনি প্রকল্প বন্ধ রাখতে হবে এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির বিতর্কিত শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, “আপনি আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার জন্য কতটা আন্তরিক আর বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য কতটা আন্তরিক, আমরা তা দেখতে চাই। এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করেন।”
তবে সরকার বা চুক্তির পক্ষে থাকা পক্ষগুলোর অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও বাজারসুবিধা সম্প্রসারণ বাংলাদেশের রপ্তানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। USTR-এর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি উভয় দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর লক্ষ্যেই করা হয়েছে।
সমাবেশে অন্যরা
তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক রফিউর রাব্বির সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব ধীমান সাহা জুয়েলের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থ, সমমনার উপদেষ্টা দুলাল সাহা, বাসদের জেলা সদস্যসচিব আবু নাঈম খান বিপ্লব এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য হাফিজুল ইসলাম প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালের ফুলবাড়ী আন্দোলন দেশের খনিজসম্পদ, বহুজাতিক কোম্পানির ভূমিকা, উন্মুক্ত খনি পদ্ধতি এবং জাতীয় সম্পদের মালিকানা প্রশ্নে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত গণআন্দোলন। দুই দশক পরও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক থামেনি। একদিকে GCM Resources এখনো প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদনের অপেক্ষায়; অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা আবার শুরু হলে নতুন করে তীব্র গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠবে।









Discussion about this post