মোবাইলের সূত্রে সম্পর্ক, আবেগে ঘরছাড়া—উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও প্রশাসনে
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কিশোর বয়সী মেয়েদের ঘর ছাড়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত তিন মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৪০ কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই মুঠোফোনে পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথোপকথন এবং পরবর্তীতে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বাড়ি ছাড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পুলিশের অনুসন্ধানে নিখোঁজ কয়েকজনের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হলেও সবার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এক নয়। কারও কারও সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ স্থাপন করা গেলেও তারা বাড়িতে ফিরতে অনীহা প্রকাশ করছে। ফলে শুধু নিখোঁজের ঘটনা হিসেবে নয়, কিশোর বয়সের আবেগ, অনলাইন যোগাযোগ, পারিবারিক দূরত্ব এবং সামাজিক সচেতনতার সংকট—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে চার কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি করা হয়। তাদের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হন।
পুলিশ জানায়, তদন্তের মাধ্যমে চারজনের মধ্যে দুজনের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি দুজনের সন্ধানেও অনুসন্ধান চলছে। তবে তারা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতিতে নিখোঁজ হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘর ছাড়ার ঘটনায় স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপে পরিচিত কিংবা অপরিচিত তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অজান্তেই দীর্ঘদিন কথাবার্তা চলার পর আবেগের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পারিবারিক বাধা, অভিভাবকের শাসন কিংবা সম্পর্ক মেনে না নেওয়ার আশঙ্কা থেকে কেউ কেউ বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
তবে সব ঘটনার সূত্র শুধু অনলাইনে নয়। স্থানীয়ভাবে পাশাপাশি বসবাস করা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার ঘটনা রয়েছে। পারিবারিকভাবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আশঙ্কা, সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ কিংবা কিশোর বয়সের আবেগী সিদ্ধান্ত—এসব কারণও ঘর ছাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
শুধু মোবাইল দায়ী নয়
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিশোরীদের ঘর ছাড়ার জন্য শুধু মুঠোফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল থেকে যাবে। কিশোর বয়সের আবেগ ও মানসিক পরিবর্তন, পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগের অভাব, সন্তান কার সঙ্গে মিশছে সে বিষয়ে পর্যাপ্ত খোঁজ না রাখা এবং অনলাইনে নিরাপদ যোগাযোগ সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পরও অনেক পরিবার বিষয়টি সামাজিকভাবে প্রকাশ করতে চায় না। বিশেষ করে প্রেমের সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়ে যাবে—এই আশঙ্কায় কেউ কেউ পুলিশকে জানাতেও দেরি করেন।
তিনি বলেন, মেয়ের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তা করে অনেকে ঘটনা গোপন রাখেন। কিন্তু সময় যত গড়ায়, ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে। দ্রুত পুলিশকে জানানো হলে অন্তত প্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্তসহ প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের সুযোগ থাকে।
স্থানীয় আরেক অভিভাবকের ভাষ্য, সন্তানদের শুধু শাসনের মধ্যে না রেখে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি। তারা কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে কিংবা কোনো মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে পরিবারের খোঁজ রাখা প্রয়োজন।
অবস্থান মিললেও জটিলতা কাটে না
পুলিশের অনুসন্ধানে কোনো কিশোরীর অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পরও সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে কেউ কেউ অনীহা প্রকাশ করে। বিশেষ করে কোনো সম্পর্কের কারণে বাড়ি ছাড়লে তাদের সিদ্ধান্ত ও মানসিক অবস্থার পেছনে চাপ, প্রলোভন বা অন্য কোনো প্রভাব রয়েছে কি না—তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে কিশোরীকে শুধু উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়। তার নিরাপত্তা, মানসিক অবস্থা এবং কোনো ধরনের প্রতারণা, ভয়ভীতি, চাপ বা প্রলোভনের শিকার হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা দরকার।
আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসের মো. আসাদুর রহমান বলেন, শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া কিংবা কঠোর শাসন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কিশোরীদের মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যায় পড়লে তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন বলেন, গত তিন মাসে ৪০টি কিশোরী নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কোনো কিশোরী নিখোঁজ হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত থানায় যোগাযোগ করা প্রয়োজন। নিখোঁজ ব্যক্তির সাম্প্রতিক ছবি, ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং সম্ভাব্য কোথায় যেতে পারে—এ ধরনের তথ্য পুলিশকে দিলে অনুসন্ধান কার্যক্রমে সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, আড়াইহাজারে কিশোরীদের ঘর ছাড়ার এই প্রবণতাকে কেবল ‘প্রেম করে পালানো’ বলে সরলীকরণ করলে সমস্যার গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে কিশোর বয়সের আবেগ, ডিজিটাল যোগাযোগের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, পারিবারিক দূরত্ব, সামাজিক ভয় এবং সচেতনতার অভাব।
সমস্যার সমাধানে তাই প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। সন্তানকে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, বোঝার চেষ্টা করা, তার সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং অনলাইন জগতের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তোলাই হতে পারে এই উদ্বেগজনক প্রবণতা মোকাবিলার অন্যতম কার্যকর পথ।








Discussion about this post