খেলনা বন্দুক হাতে ‘আফগানি বেশে’ শহরে মহড়া, আতঙ্ক ছড়িয়ে ভিডিও; দুই তরুণ কারাগারে
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ভিউ’ আর ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশায় এবার জনবহুল নারায়ণগঞ্জ শহরকেই যেন বানানো হয়েছিল ভয় দেখানোর মঞ্চ। কালো রঙের লম্বা কুর্তা-পায়জামা ও মাথায় টুপি পরে ‘আফগানি বেশে’ খেলনা বন্দুক হাতে শহরের ব্যস্ত সড়ক, উদ্যান ও দোকানের সামনে ঘুরে বেড়িয়ে ভিডিও তৈরি করেন দুই তরুণ। তাদের হাতে অস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখে পথচারী, রিকশাচালক এমনকি শিশুরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
‘প্রাঙ্ক’ ও ‘সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট’-এর নামে এমন কর্মকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে অবশেষে ওই দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এর ৪ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালতে পাঠানোর পর বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন—বন্দর উপজেলার আমিন আবাসিক এলাকার শামীম আহম্মেদের ছেলে মো. লিমন তোহা (২২) এবং একই এলাকার স্বপন মোল্লার ছেলে মো. ইয়াছিন মোল্লা (২৩)।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান জানান, শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দুই নম্বর রেলগেইট এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। শনিবার সকালে সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাখাওয়াত হোসেন বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
আদালত পুলিশের পরিদর্শক আব্দুস সামাদ জানান, মামলার পর তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক দুজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, কালো কুর্তা-পায়জামা ও মাথায় টুপি পরে লিমন ও ইয়াছিন খেলনা বন্দুক হাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনো সড়কের পাশে, কখনো উদ্যানের ভেতরে, আবার কখনো দোকানের সামনে অস্ত্র হাতে তাদের অবস্থান করতে দেখা যায়। তাদের আচরণ ও হাতে থাকা শটগান এবং এসএমজি সদৃশ বস্তু দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওগুলো লিমন নিজের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন। একটি ভিডিওতে ব্যবহার করা হয় ভারতের একটি সিনেমার ‘আফগান জালেবি’ গান। পোশাক, বন্দুকসদৃশ খেলনা ও ভিডিওর উপস্থাপনা মিলিয়ে পুরো বিষয়টিকে অনেকেই বাস্তব অস্ত্রের মহড়া বলে মনে করেন।
আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকটি ‘ভিউ’ পাওয়ার জন্য জনবহুল এলাকায় অস্ত্রসদৃশ বস্তু হাতে এভাবে ঘুরে বেড়ানো কি কেবল বিনোদন? নাকি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা?
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অস্ত্র, সহিংসতা ও অপরাধ নিয়ে জনমনে উদ্বেগের মধ্যে খেলনা হলেও বাস্তব অস্ত্রের মতো দেখতে বন্দুক হাতে প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে ভিডিও তৈরি করাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুলিশের নজরে আসে ঘটনাটি। পরে জেলা পুলিশের তথ্য ও প্রযুক্তি ইউনিট ভিডিও বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত দুই তরুণকে শনাক্ত করে এবং খোঁজ নিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
শনিবার বিকেলে জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৮ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বন্দুক হাতে দুই তরুণের ঘুরে বেড়ানোর’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নগরীর নারায়ণগঞ্জ সিটি পার্কে, যার আগের নাম শেখ রাসেল নগর পার্ক, ধারণ করা হয়েছিল।
পুলিশ বলেছে, গ্রেপ্তার দুজন শটগান ও এসএমজি সদৃশ দুটি প্লাস্টিকের বন্দুক হাতে মহড়া দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জেলা পুলিশ জানায়, “বিনোদনের নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি, পথচারী ও শিশুদের ভয় দেখানো এবং সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। খেলনা অস্ত্র হলেও এর মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা গুরুতর অপরাধ।”
তবে গ্রেপ্তার লিমনের পরিবারের দাবি, পুরো ঘটনাটি ছিল নিছক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য তৈরি করা একটি ‘প্রাঙ্ক ভিডিও’।
লিমনের মা লাইজু আক্তার মুঠোফোনে বলেন, তার ছেলে লিমন এবং ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরি করেন। প্রায় ১০ দিন আগে খেলনা বন্দুক ব্যবহার করে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছিল। ভিডিও তৈরিতে লিমনের বন্ধু ইয়াছিন সহযোগিতা করেন।
তার দাবি, বিষয়টি এত বড় আকার নেবে, তা তারা বুঝতে পারেননি।
লাইজু আক্তার বলেন, “আমাদের রাতে ফোন দিয়ে থানায় ডাকা হয়। পরে আমরা জানতে পারি, খেলনা বন্দুক নিয়ে ভিডিও করলেও তা বেআইনি। কিন্তু ওরা তো মজার ছলেই করেছে। আমরা সাধারণ পরিবারের লোকজন। এতকিছু বুঝি না।”
তিনি আরও বলেন, বিদেশে এ ধরনের ভিডিও দেখে তার ছেলেও একই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করেছিল। এখন ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন।
জানা গেছে, লিমন ২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জ কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি আর কোথাও ভর্তি হননি। তার বাবা বন্দরের একটি ডকইয়ার্ডে হেল্পার হিসেবে কাজ করেন। পরিবারটি বন্দরে ভাড়া বাসায় বসবাস করে।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, ‘মজার ছলে’ করা একটি ভিডিওর জন্য কি জনবহুল এলাকায় এমন পরিবেশ তৈরি করা যায়, যেখানে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারছেন না হাতে থাকা বস্তুটি আসল অস্ত্র নাকি খেলনা? বাস্তব অস্ত্রের মতো দেখতে বন্দুক হাতে দুই তরুণের প্রকাশ্য ঘোরাফেরা যদি পথচারী ও শিশুদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে, তাহলে সেটিকে নিছক ‘কনটেন্ট’ বা ‘প্রাঙ্ক’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ কতটুকু?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত পরিচিতি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় দিন দিন বাড়ছে চরমপন্থী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা। কখনো প্রাণঘাতী স্টান্ট, কখনো উচ্ছৃঙ্খলতা, কখনো অপরাধের দৃশ্য অনুকরণ—আর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো অস্ত্রসদৃশ খেলনা হাতে জনবহুল এলাকায় ‘মহড়া’।
ভিডিও বানানোর স্বাধীনতা আছে, বিনোদনের অধিকারও আছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যখন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, শিশু ও পথচারীদের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে, তখন তা আর নিছক ‘মজা’ থাকে না—তা পরিণত হয় দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে।
নারায়ণগঞ্জে ভাইরাল হওয়ার নেশায় খেলনা বন্দুক হাতে এই দুই তরুণের ‘মহড়া’ তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ভিডিওকাণ্ড নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমাহীন ও বেপরোয়া কনটেন্ট তৈরির বিপজ্জনক প্রবণতারও একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।








Discussion about this post