রয়েল রিসোর্টে ‘হত্যার নীলনকশা’র দাবি মামুনুলের
২০২১ সালের সেই ঘটনার পাঁচ বছর পর নতুন করে আলোচনায় সোনারগাঁ; একদিকে তাণ্ডবের মামলা, অন্যদিকে ইকবালের মৃত্যু নিয়ে ১২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টে ২০২১ সালের বহুল আলোচিত ঘটনার পাঁচ বছর পর আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে মামুনুল হককে ঘিরে সেই দিনের ঘটনা। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক এবার দাবি করেছেন, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ‘নীলনকশা’ করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে তাঁর এ দাবির বিপরীতে ২০২১ সালের সমসাময়িক সংবাদ ও পুলিশের বক্তব্যে উঠে এসেছিল ভিন্ন চিত্র—স্থানীয় লোকজন তাঁকে এক নারীসহ রিসোর্টে দেখতে পেয়ে অবরুদ্ধ করেন, পরে হেফাজতের নেতাকর্মীদের ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের মধ্যে তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে বের করে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় একাধিক মামলা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট একটি ধর্ষণ মামলায় ২০২৪ সালে আদালত তাঁকে খালাস দেন।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে সোনারগাঁ উপজেলা অডিটোরিয়াম হলরুমে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত মাওলানা ইকবাল হোসাইন স্মরণে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মামুনুল হক এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১ সালে রয়েল রিসোর্টে আমাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার নীলনকশা করেছিল। সেই নীলনকশায় তারা নিজেরাই ফেঁসে গেছে। ওইদিন তৌহিদী জনতার তোপের মুখে পড়ে বাঁচার জন্য আকুতি-মিনতি করে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কাউকে রয়েল রিসোর্টে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাড়িঘর ফেলে তারা পালাতে বাধ্য হয়েছে।”
মামুনুল হক আরও দাবি করেন, তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের কণ্ঠরোধ করতে তৎকালীন সরকার মিথ্যা মামলার আশ্রয় নিয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের রয়েল রিসোর্টের ঘটনাসহ হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলাগুলো পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এই দাবির বিষয়ে প্রকাশ্য নথি ও বিভিন্ন সময়ের সংবাদে মামলাগুলোর সংখ্যা, অবস্থা এবং প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের মে মাসেও হেফাজতে ইসলাম দাবি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া শত শত মামলার মধ্যে সব মামলা তখনও প্রত্যাহার হয়নি।
কী ঘটেছিল ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল ?
২০২১ সালের ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে মামুনুল হক এক নারীসহ অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় লোকজন সেখানে তাঁকে ঘিরে ফেলেন। মামুনুল হক ওই নারীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে হেফাজতে ইসলামের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক সেখানে জড়ো হন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন।
সমসাময়িক একাধিক সংবাদে রিসোর্টে ভাঙচুর, গাড়ি ভাঙচুর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভের তথ্য উঠে আসে।
তৎকালীন পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়নি; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁর নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সেখানে উপস্থিত ছিল। পরে উত্তেজিত সমর্থকদের চাপ ও ব্যাপক বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি রিসোর্ট এলাকা ত্যাগ করেন। অন্যদিকে হেফাজত নেতারা সে সময় দাবি করেছিলেন, স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাঁকে অন্যায়ভাবে অবরুদ্ধ ও হেনস্তা করেছিলেন।
ঘটনার পর প্রথমে তিনটি মামলা এবং পরে আরও কয়েকটি মামলা দায়ের হয়। ৯ এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত রয়েল রিসোর্টকেন্দ্রিক ঘটনায় সোনারগাঁ থানায় অন্তত ছয়টি মামলা দায়ের হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এসব মামলার কয়েকটিতে মামুনুল হককে আসামি করা হয়েছিল।
এ কারণে শনিবারের বক্তব্যে মামুনুল হক যে “পরিকল্পিত হত্যার নীলনকশা” এবং **“২৪ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পালিয়ে যাওয়া”**র কথা বলেছেন, তা তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমসাময়িক পুলিশি নথি বা সংবাদে ওই সময় তাঁকে হত্যার কোনো পরিকল্পনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
‘কথিত ধর্ষণ মামলা’ থেকে খালাস
রয়েল রিসোর্টের ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর, ২০২১ সালের ৩০ এপ্রিল, ওই ঘটনায় আলোচিত নারী মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং বিচার কার্যক্রম চলে।
তবে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামুনুল হককে ওই মামলায় বেকসুর খালাস দেন। রায়ের পর তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেন, মামুনুল হকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। মামুনুল হকও তখন বলেছিলেন, তাঁকে হয়রানি করার জন্য মামলাটি করা হয়েছিল।
তবে একটি মামলায় খালাস পাওয়ার অর্থ রয়েল রিসোর্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া সব মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। রয়েল রিসোর্টের ঘটনা, সহিংসতা ও ভাঙচুরের মামলাগুলো এবং ধর্ষণের অভিযোগের মামলা ছিল পৃথক আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়।
ইকবাল হোসেনের মৃত্যু: দুই বর্ণনা, পরে নতুন মামলা
শনিবারের সভার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল সোনারগাঁ খেলাফত মজলিসের তৎকালীন সভাপতি ও হেফাজত নেতা মাওলানা ইকবাল হোসেনের মৃত্যু। মামুনুল হক দাবি করেন, রয়েল রিসোর্টের ঘটনায় দায়ের করা ‘মিথ্যা মামলায়’ গ্রেপ্তারের পর ইকবাল হোসেন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান এবং তাঁকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করেন।
২০২১ সালের সমসাময়িক প্রতিবেদনে অবশ্য তৎকালীন কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। ইকবাল হোসেন সহিংসতার একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন এবং অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে কয়েক দফা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কারা কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তিনি আগে থেকেই হৃদ্রোগ ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ মে ২০২১ তিনি মারা যান বলে সে সময়ের সংবাদে উল্লেখ করা হয়। তাঁর পরিবার অবশ্য তখন তাঁকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো এবং যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিল।
পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে মামলা দায়ের হয়। সোনারগাঁ থানায় হেফাজতের সদস্য মাওলানা শাজাহান শিবলীর করা মামলায় নারায়ণগঞ্জের সাবেক দুই সংসদ সদস্য, সাবেক পুলিশ সুপারসহ ১২৮ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, রয়েল রিসোর্টে মামুনুল হককে হেনস্তার ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইকবাল হোসেন হামলার শিকার হন, পরে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এগুলো মামলার অভিযোগ; অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালত বা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।
পুরোনো ঘটনা, নতুন রাজনৈতিক বয়ান
রয়েল রিসোর্টের ঘটনা শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছিল। এক পক্ষের বক্তব্য ছিল, মামুনুল হককে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। অন্য পক্ষের দাবি ছিল, ঘটনাটির জেরে তাঁর সমর্থকেরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে রিসোর্ট ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুর চালায়।
পাঁচ বছর পর এসে মামুনুল হকের নতুন বক্তব্যে ঘটনাটি আবার রাজনৈতিকভাবে সামনে এসেছে। তাঁর ‘হত্যার নীলনকশা’র অভিযোগ এখনো একটি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দাবি। অপরদিকে ২০২১ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলো, তাঁর বিরুদ্ধে করা ধর্ষণ মামলায় খালাস এবং ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় ২০২৪ সালে দায়ের হওয়া নতুন মামলা—সব মিলিয়ে রয়েল রিসোর্টের সেই ঘটনা এখনো নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বহুমাত্রিক অধ্যায়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল কাদের নদভী কাসেমীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, ময়মনসিংহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ উল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খানসহ অন্যরা।









Discussion about this post