সিজারের টেবিলে ‘ভুলের ছুরি’! প্রসূতির নাড়ি কাটার অভিযোগে সংকটাপন্ন সিনথিয়া
মদনপুরের মা হসপিটালের গাইনি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, ঢাকা মেডিকেলে আইসিইউতে ২৩ বছরের তরুণী মা
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মা হওয়ার আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে।
নারায়ণগঞ্জের বন্দরের মদনপুরে মা হসপিটালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের ভুলে এক প্রসূতি নারীর অভ্যন্তরীণ নাড়ি কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের পর অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসায় একের পর এক জটিলতায় এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ২৩ বছর বয়সী সিনথিয়া রহমান।
বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
ভুক্তভোগী সিনথিয়া রহমান নারায়ণগঞ্জ নগরীর মাসদাইর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুমের স্ত্রী। তার স্বজনদের দাবি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সিনথিয়ার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন। এমনকি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়েও শঙ্কার কথা শুনেছেন তারা।
সিনথিয়ার স্বামী মোহাম্মদ মাসুমের অভিযোগ, তার শ্বশুরবাড়ি মদনপুর এলাকায় হওয়ায় সন্তান প্রসবের জন্য স্ত্রীকে মদনপুরের মা হসপিটালে নেওয়া হয়।
সেখানে গাইনি চিকিৎসক সায়মা আক্তারের তত্ত্বাবধানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। আর সেই অস্ত্রোপচারের সময়ই চিকিৎসকের ভুলে সিনথিয়ার পেটের ভেতরের একটি নাড়ি কেটে যায় বলে তারা পরে জানতে পারেন।
মাসুমের ভাষ্য, সিজারের পর থেকেই স্ত্রীর পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। কিন্তু সেই ব্যথা ক্রমেই বেড়ে গেলেও বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার। কয়েক দিন পর অবস্থার আরও অবনতি হলে আবারও তাকে মা হসপিটালে নেওয়া হয়। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রস্রাব না হওয়ায় পেট ফুলে গেছে এবং প্রস্রাব হলে সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে বলে জানানো হয়—এমন দাবি করেছেন সিনথিয়ার স্বামী।
কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত সিনথিয়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
মাসুম জানান, ঢাকা মেডিকেলে অস্ত্রোপচারের সময় তার স্ত্রীর পেটের ভেতর জমে থাকা হজম না হওয়া খাবার ও অন্যান্য বর্জ্য বের করা হয়। বর্তমানে একাধিক জটিলতা নিয়ে সিনথিয়া আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার জ্বরও কমছে না বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
একটি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর কেন একজন তরুণী মাকে একের পর এক অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হলো—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এনেছেন স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, শুরুতেই চিকিৎসায় ভুল ও পরবর্তী সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই সিনথিয়ার অবস্থা এতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিনথিয়ার স্বামী মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘২৩ বছরের একটি মেয়ে একসঙ্গে এতগুলো অপারেশন কীভাবে সহ্য করবে? আমরা আমার স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের সন্তান জন্মের পর থেকে এখনো মায়ের দুধ খেতে পারছে না।’
তার অভিযোগ, একটি সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য হাসপাতালে নেওয়া স্ত্রী এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এ ঘটনায় মা হসপিটাল ও অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত গাইনি চিকিৎসক সায়মা আক্তার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তার দাবি—অস্ত্রোপচারের সময় তিনি কোনো ধরনের ভুল করেননি এবং নিয়ম মেনেই সবকিছু সম্পন্ন করেছেন।
মা হসপিটালের পরিচালক দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। যে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি সবকিছু ঠিকঠাকভাবেই করেছেন। তারপরও হাসপাতালের পক্ষ থেকে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আমরা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব।’
তবে অভিযুক্ত চিকিৎসক সায়মা আক্তারের সরাসরি বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি আমি এখনো শুনিনি। তবে তদন্ত করে অবশ্যই দেখব, চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি আছে কি না। গাফিলতি পাওয়া গেলে আইনগতসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্বজনদের প্রশ্ন, একজন প্রসূতি নারী সিজারের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কীভাবে তিনি এখন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন? অস্ত্রোপচারের সময় সত্যিই কোনো অঙ্গ বা নাড়ি কাটা হয়েছিল কি না, পরবর্তী সময়ে তার শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণ কী, আর অভিযোগ পাওয়ার পরও যথাসময়ে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তেই বেরিয়ে আসতে হবে।
রোগীর স্বজনরা ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি বা অবহেলা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, ‘একটি পরিবারের সর্বনাশের দায় যেন শুধু দুঃখ প্রকাশে চাপা না পড়ে—প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক, আর দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।’









Discussion about this post