নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
মুঘল স্থাপত্যের সাক্ষী, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রায় পাঁচ শতাব্দীর পুরোনো নিদর্শন সোনারগাঁয়ের ‘বড় সরদার বাড়ি’।
অভিযোগ উঠেছে, বাণিজ্যিক শুটিংয়ের জন্য ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি কোক স্টুডিওর কাছে ভাড়া দেওয়ার পর অস্থায়ী স্থাপনা অপসারণের সময় ভবনটির কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটির এমন ক্ষতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে দ্রুত তদন্ত এবং বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির নেতারা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সংগঠনের আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস বলেন, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন জাদুঘর চত্বরে অবস্থিত বড় সরদার বাড়ি মুঘল স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সম্প্রতি শুটিংয়ের জন্য কোক স্টুডিওর কাছে বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া হয়।
তাঁর অভিযোগ, শুটিং শেষে নির্মিত অস্থায়ী স্থাপনাগুলো খুলে নেওয়ার সময় মূল ভবনের বেশ কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কিছু অংশ ভেঙে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও প্রত্নঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত একটি স্থাপনা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না। শুটিংয়ের সময় এবং পরে ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞদের কোনো তদারকি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানান তারা।
তাদের ভাষ্য, কয়েকশ বছরের পুরোনো একটি স্থাপনার ক্ষতি শুধু ইট-পাথরের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পরিধি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
নেতারা বলেন, বড় সরদার বাড়ির কোনো সংস্কারকাজ সাধারণ ভবনের মতো করে করা যাবে না। ভবনটির মূল নকশা, নির্মাণশৈলী ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে প্রত্নতত্ত্ব ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরুদ্ধার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানান তারা।
তারা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে জরুরি সংরক্ষণকাজ শুরুর দাবি জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক স্থাপনা বাণিজ্যিক শুটিং বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের আগে কঠোর নীতিমালা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত চারু ও কারুশিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের লোকজ ঐতিহ্য ও কারুশিল্প রক্ষায় তাদের যথাযথ মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক কবি রহমান মুজিব, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি ধীমান সাহা জুয়েলসহ অন্য নেতারা বক্তব্য দেন।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কোক স্টুডিও বা বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
প্রায় পাঁচ শতাব্দীর পুরোনো বড় সরদার বাড়ি এখন নতুন এক প্রশ্নের মুখে—বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিনিময়ে কি যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিল ইতিহাসের এই স্থাপনা ?
নাকি শুটিংয়ের আলো নিভে যাওয়ার পর সামনে এসেছে শত বছরের ঐতিহ্য রক্ষায় অব্যবস্থাপনার আরেকটি চিত্র ?








Discussion about this post