দিনমজুর থেকে বিপুল সম্পদের মালিক—মোকাররম সরদারের উত্থানের নেপথ্যে কারা ?
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের অনেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আত্মগোপনে চলে গেলেও ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছেন কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক চেয়ারম্যান মোকাররম সরদার—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দিনমজুরি থেকে রাজনৈতিক প্রভাব
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মোকাররম সরদার একসময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলা-আলীগঞ্জ এলাকায় মাত্র ৮০ টাকা দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবেক ডিবি কর্মকর্তা ও পরবর্তীকালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন পদে থাকা হারুনুর রশিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে নারায়ণগঞ্জে মোকাররমের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। এমনকি আলীগঞ্জের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে তার লেবার অফিসে হারুনুর রশিদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলেও স্থানীয়দের দাবি। তবে এ সম্পর্কের প্রকৃতি এবং এর সঙ্গে মোকাররমের ব্যবসায়িক উত্থানের কোনো সরাসরি যোগসূত্র ছিল কি না, তা নথিপত্র দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
আলীগঞ্জে চার বহুতল ভবন, প্লটের ছড়াছড়ি
ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায়, যেখানে একসময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন মোকাররম, সেখানেই বর্তমানে তার চারটি বহুতল ভবন রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ভবনগুলো স্থানীয়ভাবে ‘এসপির বাড়ি’ নামেও পরিচিত ছিল বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া পাগলা-আলীগঞ্জ এলাকায় তার নামে-বেনামে আরও আট থেকে দশটি প্লট থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পত্তি কখন, কীভাবে এবং কী অর্থে কেনা হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দলিল, নামজারি, খাজনা ও রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত নথি যাচাই করা জরুরি।
নিকলীতে পাঁচ কোটি টাকার ডুপ্লেক্স
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার উত্তর দামপাড়া মৌজায় প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ জমির ওপর মোকাররম সরদার একটি বিশাল তিনতলা ডুপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের হিসাবে, জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা এবং ভবন নির্মাণে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় এমন ব্যয়বহুল বাড়ি নির্মাণ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একসময় দৈনিক মজুরিতে কাজ করা একজন ব্যক্তি কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন? তার আয়ের বৈধ উৎস কী? ব্যবসা থেকে কত আয় হয়েছে এবং সম্পদ অর্জনের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসবের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জ শহরেও কোটি টাকার সম্পদ
অভিযোগ রয়েছে, কিশোরগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ায় প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের একটি বাড়িও কিনেছেন মোকাররম সরদার। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় তার নামে-বেনামে একাধিক ইটভাটা রয়েছে বলেও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
তবে ইটভাটার সংখ্যা, মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাই ছাড়া এ দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে তার ঘোষিত আয় ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে বাস্তব সম্পদের কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়।
পলাশের ব্যবসা দেখভালের অভিযোগ
শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাওছার আহমেদ পলাশের সঙ্গেও মোকাররম সরদারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা যৌথভাবে বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
৫ আগস্টের পর পলাশ আত্মগোপনে চলে গেলেও মোকাররম এলাকায় থেকে তার বিভিন্ন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখভাল করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
পলাশের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আবুল হোসেন, শাহাদাত হোসেন সেন্টু ও আজিজুল ইসলামসহ কয়েকজনের সঙ্গে মোকাররমের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, ব্যাংক লেনদেন, অংশীদারি চুক্তি, কোম্পানি ও ট্রেড লাইসেন্সের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
চেয়ারম্যান নির্বাচনে কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ
মোকাররম সরদার নিকলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। কারও কারও দাবি, নির্বাচনে তার ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা।
অভিযোগটি সত্য হলে অর্থের উৎস এবং নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব এবং প্রার্থীর সম্পদ বিবরণী যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।
সব রাজনৈতিক শিবিরেই প্রভাব ?
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিকলীর আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোকাররমের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল।
তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকাকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ।
৫ আগস্টের পরও কীভাবে সক্রিয় ?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোকাররম সরদারের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কিছু সময় আত্মগোপনে থাকলেও পরবর্তীতে এলাকায় ফিরে আবারও ব্যবসা-বাণিজ্যে সক্রিয় হন।
তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা থাকলে সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী, তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি না, জামিনে মুক্ত হয়ে থাকলে কোন আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন এবং বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি না—এসব তথ্য আদালতের নথি ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্তের দাবি
একজন সাধারণ শ্রমিক থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক বহুতল ভবন, কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, জমি ও ব্যবসায়িক সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
সম্পদের উৎস কী? কোন ব্যবসা থেকে কত আয়? সম্পদগুলো নিজের নামে, নাকি অন্যের নামে? ব্যবসায়িক অংশীদার কারা? রাজনৈতিক প্রভাব কি ব্যবসা সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন ভূমি রেকর্ড, রেজিস্ট্রি দলিল, আয়কর নথি, কোম্পানি ও ট্রেড লাইসেন্স, নির্বাচনী হলফনামা, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথি যাচাই।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মোকাররম সরদারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করেই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব হবে—তিনি বৈধ ব্যবসা ও আয়ের মাধ্যমে সম্পদ গড়েছেন, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের সুযোগ নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মোকাররম সরদারের সম্পদ, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রশাসনিক প্রভাবের উৎস নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন।









Discussion about this post