সার লোড-আনলোডে কথিত অবৈধ ঘাট
মোকারম সরদারের ঘাট ঘিরে নানা অভিযোগ, সরকারি ভর্তুকির সার কোথায় যাচ্ছে?
মহানগর প্রতিনিধি :
সরকারি ভর্তুকিতে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া রাসায়নিক সার নির্ধারিত ঘাটের বাইরে লোড-আনলোড, গোপনে মজুত এবং অতিমুনাফার উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ মাদ্রাসা এলাকার কথিত মোকারম সরদারের ঘাট এবং মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর এলাকার কয়েকটি ঘাটকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ব্যবস্থাপনায় আমদানি করা ভর্তুকির সার আসলে কোথায় যাচ্ছে এবং এর কতটুকু কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে ?
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সার পরিবহন ও সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত ঘাট থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন নামে-বেনামে বা অনুমোদনহীন ঘাট ব্যবহার করে সার লোড-আনলোড করা হচ্ছে। এতে সরকারি নজরদারি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সারের প্রকৃত হিসাব নিয়েও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্ধারিত ঘাটের বাইরে লোড-আনলোডের অভিযোগ
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সার ব্যবসায়ী জানান, মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ মাদ্রাসা এলাকার ঘাট দিয়ে সরকারি ভর্তুকির সার লোড-আনলোড করা হচ্ছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।
তাদের দাবি, এসব ঘাটে সরকারি সার ওঠানো-নামানোর বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ঘাটের পরিবর্তে অন্যত্র সার ওঠানো-নামানো হলে চালান, পরিবহন ও মজুতের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র সরকারি ভর্তুকির সার অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে বলেও তাদের আশঙ্কা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং কোনো ঘাটে কী ধরনের সার লোড-আনলোড হচ্ছে, তা সরেজমিন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পুরোনো পাচার অভিযোগ ঘিরে নতুন প্রশ্ন
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, অতীতে সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের মাধ্যমে মোকারম সরদারের ঘাট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে একই ঘাটকে ঘিরে সরকারি ভর্তুকির সার লোড-আনলোড ও মজুতের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে অতীতের পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটি তদন্তসাপেক্ষ।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, অতীতে সার পাচারের অভিযোগে আলোচিত নৌপথ ও ঘাটগুলোর কার্যক্রম নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
গোপন মজুতের অভিযোগ
সারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী আরও অভিযোগ করেন, কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মোকারম সরদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার তথ্য রয়েছে এবং তিনি ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় সার মজুতের জন্য একাধিক গোডাউন তৈরি করেছেন বলে তারা দাবি করেন।
তাদের অভিযোগ, এসব স্থানে গোপনে সার মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে গোডাউনগুলোর মালিকানা, সেখানে কী পরিমাণ সার মজুত রয়েছে এবং মজুতের বৈধ কাগজপত্র আছে কি না—এসব বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন।
সার ভেজানোর অভিযোগ
এদিকে ডিএপি ও টিএসপি সারের বস্তায় পানি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, বস্তা ভেজানোর মাধ্যমে ওজন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে শুধু ওজনের হিসাবেই অনিয়ম হবে না, আর্দ্রতার কারণে সারের গুণগত মানেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বিষয়টি কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
খোলা আকাশের নিচে সার রাখার অভিযোগ
ফতুল্লার আলীগঞ্জ মাদ্রাসা এলাকার ঘাটে সার খালাসের পর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জাহাজ থেকে সার খালাসের পর নির্ধারিত গুদামে সংরক্ষণের পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোলা আকাশের নিচে বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বস্তা রাখা হচ্ছে। এতে সার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের কাছে নিম্নমানের সার পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
১৯ জেলার জন্য নির্ধারিত ঘাট
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের মধ্যবর্তী ১৯ জেলার জন্য নারায়ণগঞ্জের নির্ধারিত ৪ থেকে ৯ নম্বর ঘাটে সার লোড-আনলোডের ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কিছু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী নির্ধারিত ঘাটের পরিবর্তে অনুমোদনহীন বা অঘোষিত ঘাট ব্যবহার করছেন। এতে সরকারি সারের সরবরাহ, পরিবহন ও মজুতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনাতেও প্রশ্ন
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, আমদানিকৃত রাসায়নিক সার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, নগরবাড়ী ও নোয়াপাড়া পয়েন্টে নির্দিষ্ট হারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
এই ব্যবস্থার বাইরে সার লোড-আনলোড বা মজুত করা হলে সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সরকারি ভর্তুকির অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিআইডব্লিউটিএর বক্তব্য
নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এর আগে জানিয়েছিলেন, ফতুল্লা মাদ্রাসা ঘাট ও মুন্সীগঞ্জের কিছু ঘাট দিয়ে সার লোড-আনলোড হলেও সেগুলো ব্যক্তিগত পণ্যের অনুমোদনের আওতায়; সরকারি সার নয়।
তিনি আরও জানিয়েছিলেন, অনিয়মের কারণে কিছু লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নির্ধারিত পোর্ট এলাকার মাধ্যমেই সার লোড-আনলোড নিশ্চিত করা হবে।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব পদক্ষেপের পরও কথিত অননুমোদিত ঘাটে সার ওঠানো-নামানোর অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার সংকট
অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার সংকট, অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ সামনে আসছে। কোথাও কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে, কোথাও সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। আবার বিভিন্ন অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা সার উদ্ধারের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের কথিত অননুমোদিত ঘাটে সরকারি সার লোড-আনলোড বা মজুতের অভিযোগ নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
তদন্তের দাবি
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি ভর্তুকির সার কোন জাহাজ থেকে কোন ঘাটে খালাস হচ্ছে, কত পরিমাণ সার আসছে, কোথায় যাচ্ছে এবং নির্ধারিত গুদামে কতটুকু জমা হচ্ছে—এসব তথ্য সমন্বিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ফতুল্লার আলীগঞ্জ মাদ্রাসা এলাকার কথিত মোকারম সরদারের ঘাট ও মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরের ঘাটগুলোতে সরকারি সার লোড-আনলোডের অনুমোদন আছে কি না, সংশ্লিষ্ট ঘাটের লাইসেন্স বৈধ কি না এবং সেখানে সরকারি ভর্তুকির সার মজুত বা স্থানান্তর হয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি উঠেছে।
সরকারি ভর্তুকির অর্থে আমদানি করা সার কৃষকের জন্য নির্ধারিত। ফলে নির্ধারিত ঘাটের বাইরে সার লোড-আনলোড, অবৈধ মজুত কিংবা পাচারের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে মোকারম সরদার বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট ঘাটের অনুমোদনপত্র, বিআইডব্লিউটিএর রেকর্ড, সার আমদানির চালান, পরিবহন নথি, গুদামজাতকরণ হিসাব এবং কৃষি বিভাগের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।









Discussion about this post