নামজারিতে ১০ শতাংশ জমি ঘুষের দাবি?
সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা, অভিযোগ উঠেছে ‘জমি’ চাওয়ার; অডিও ক্লিপ ঘিরে তোলপাড়
মহানগর প্রতিনিধি :
জমির নামজারি—সরকার নির্ধারিত ফি যেখানে মাত্র ১ হাজার ১৭০ টাকা, সেখানে নগদ অর্থের বদলে এবার সরাসরি জমি চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ, ৭৩ শতাংশ ভিটি জমির নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে প্রথমে ১০ শতাংশ জমি দাবি করা হয়। পরে ৫ কাঠা বা সাড়ে ৭ শতাংশ জমি দেওয়ার শর্তে নামজারির কাজ করে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়।
অভিযোগের এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম। এরই মধ্যে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের সঙ্গে কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ গণমাধ্যমের হাতে এসেছে।
ওই অডিওতে উপর মহলে টাকা পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গেও কথা বলতে শোনা যায় বলে অভিযোগকারীর দাবি।
সরকারি বিধান অনুযায়ী, জমির পরিমাণ কম-বেশি হলেও নামজারির নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা। এর মধ্যে কোর্ট ফি ২০ টাকা, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা এবং রেকর্ড সংশোধন ফি ১ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মৌজায় ৭৩ শতাংশ ভিটি জমির নামজারি করে দেওয়ার জন্য জনৈক সাজিদের কাছে জমির অংশ দাবি করেন দুলাল চন্দ্র দেবনাথ। প্রথমে ১০ শতাংশ জমি চাওয়া হলেও পরবর্তীতে ৫ কাঠা অর্থাৎ সাড়ে ৭ শতাংশ জমি দেওয়ার শর্তে কাজটি করে দেওয়ার বিষয়ে তিনি রাজি হন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়—অভিযোগটি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে জমিটির সম্ভাব্য বাজারমূল্যের কারণে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিমরাইল মৌজায় সংশ্লিষ্ট ভিটি জমির সরকারি মূল্য শতাংশপ্রতি প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা হলেও স্থানীয়ভাবে জমিটির ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
সে হিসাবে সাড়ে ৭ শতাংশ জমির কথিত বাজারমূল্য দাঁড়ায় আনুমানিক ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ফলে নামজারির মতো একটি সরকারি সেবার বিনিময়ে জমির অংশ দাবি করার অভিযোগ সত্য হলে তা নিছক ‘ঘুষ’ নয়—অভিযোগটির আর্থিক মাত্রাও অত্যন্ত গুরুতর।
অভিযোগের পর অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে ভূমি অফিস
দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে ঘিরে এর আগেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী ও সেবাপ্রত্যাশীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষকে সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানি ও অনিয়মের মুখোমুখি হতে হয়। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
সর্বশেষ জমির নামজারির বিনিময়ে জমি চাওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় সেই পুরোনো প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে—সরকারি সেবার মূল্য কি নির্ধারিত ফি, নাকি সেবাপ্রার্থীর জমির অংশ?
অডিও ক্লিপে ‘উপর মহলে’ টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গ
গণমাধ্যমের হাতে আসা কথোপকথনের অডিও ক্লিপে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের কণ্ঠস্বর বলে দাবি করা ব্যক্তিকে উপর মহলে টাকা পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুলাল দেবনাথের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেটকে বলেন, “এমন কোনো ঘটনা আমার জানা নাই।”
অর্থাৎ তিনি অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
এসিল্যান্ডের বক্তব্য মেলেনি
বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর বক্তব্য জানতে তার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাংবাদিকদের ফোন রিসিভ করেননি।
ফলে অভিযোগটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের দাবি
নামজারির সরকারি ফি যেখানে নির্দিষ্ট, সেখানে কোনো কর্মকর্তা যদি সেবার বিনিময়ে জমির অংশ দাবি করে থাকেন—তাহলে অভিযোগটি প্রমাণিত হলে তা সরকারি সেবা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
তাই শুধু অভিযোগ অস্বীকার করেই বিষয়টি শেষ করার সুযোগ নেই। কথিত অডিও ক্লিপের ফরেনসিক যাচাই, সংশ্লিষ্ট নামজারি আবেদনের নথি পরীক্ষা, অভিযোগকারীর বক্তব্য গ্রহণ এবং জমির মালিকানা ও কথিত লেনদেনের তথ্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা উদঘাটন জরুরি।
প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ভূমি অফিসে নামজারির ফি যদি ১ হাজার ১৭০ টাকা হয়, তাহলে ৭৩ শতাংশ জমির নামজারির বিনিময়ে সাড়ে ৭ শতাংশ জমি চাওয়ার অভিযোগের নেপথ্যে আসলে কী?
এর উত্তর খুঁজতেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দিকে।









Discussion about this post