রূপগঞ্জে সাঁওতাল তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু
গলায় আঘাতের চিহ্ন, নিখোঁজ মোবাইল; বাড়ির মালিকের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন
রূপগঞ্জ প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুরাপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালিতে রিয়া সরেন (১৯) নামে এক সাঁওতাল তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে ভাড়া বাসা থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে ও পরে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
রিয়া সরেন ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। স্বামীহারা মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে জীবিকার তাগিদে মাত্র ১৯ বছর বয়সে রূপগঞ্জের এসিআই সল্ট লিমিটেডে (ACI Salt Limited) চাকরি নেন তিনি। মঙ্গলখালিতে একটি টিনশেড ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন রিয়া।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের অভিযোগ, একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চপদে থাকা তানিয়া নামের এক নারী রিয়াকে নিজের কাছাকাছি রাখতেন। রিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল সিমটিও তানিয়ার নামে ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
ধর্মান্তর ও বিয়ের অভিযোগ
রিয়ার স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তানিয়া বেগম রিয়াকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা বিভিন্ন সময় প্রকাশ করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে তানিয়ার বক্তব্য বা কোনো লিখিত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মৃত্যুর পর বক্তব্যে অসঙ্গতির অভিযোগ
৭ সেপ্টেম্বর সকালে রিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে আরও প্রশ্ন দেখা দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির মালিকপক্ষের কেউ কেউ প্রথমদিকে রিয়া ‘স্ট্রোকে’ মারা গেছেন বলে দাবি করেন। পরে রিয়ার গলায় ফাঁস বা দড়ির মতো গভীর দাগ দেখা যাওয়ার কথা জানাজানি হলে তাকে আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করা হয়।
পরিবার ও স্থানীয়দের প্রশ্ন—রিয়া যদি আত্মহত্যা করে থাকেন, তাহলে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় কে এবং কীভাবে দেখতে পেয়েছিলেন? স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তারা রিয়ার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেননি। বাড়ির মালিকপক্ষ নিজেরাই লাশ নামিয়েছেন বলে যে বক্তব্য এসেছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রহস্যজনকভাবে মোবাইল ফোন গায়েব ?
রিয়ার মা জানান, ৬ সেপ্টেম্বর ডে-শিফটের কাজ শেষে রাতে খাবার খাওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছিল। কিন্তু পরদিন সকালে রিয়ার মরদেহ উদ্ধারের সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।
মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে রিয়ার যোগাযোগ হয়েছিল, শেষবার কার সঙ্গে কথা হয়েছিল এবং তার মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল—এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে বলে মনে করছেন স্বজনরা।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
পরিবারের দাবি, রিয়ার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশের পৌঁছাতে সময় লেগেছিল। পরে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্তও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা বা লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। দরিদ্র ও অসহায় পরিবারটি আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও করেছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
রিয়ার মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। গলায় আঘাতের চিহ্ন, মৃত্যুর পরপরই দেওয়া বক্তব্যের পরিবর্তন, মোবাইল ফোনের অনুপস্থিতি এবং ধর্মান্তর ও বিয়ের অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘Justice for Riya Soren’ হ্যাশট্যাগে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
রিয়ার পরিবারের প্রত্যাশা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, মোবাইল ফোনের কল ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করে তদন্তকারীরা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করবেন।









Discussion about this post