ভূমি কর্মকর্তার সামনেই মারধর, হত্যার হুমকির অভিযোগ
জমি দখল ঘিরে ইকবালের বিরুদ্ধে ফের গুরুতর অভিযোগ; আগেও সাংবাদিক লাঞ্ছনা ও জমি দখলের অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সরকারি ভূমি কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই অভিযোগকারী ও তাঁর স্বজনদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে। শুধু মারধর নয়, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর লাশ গুমের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
গত বুধবার দুপুরে ফতুল্লার রঘুনাথপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জমির মালিক দাবি করা কাশেম মোল্লার ভাতিজা সিয়ামকে থাপ্পড় মারতে দেখা যায়। ভিডিওতে ঘটনাস্থলে ফতুল্লা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিল্টন রায়কেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
এ ঘটনায় কাশেম মোল্লার স্ত্রী কহিনুর আক্তার বাদী হয়ে ইকবাল হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ফতুল্লা মডেল থানার এসআই শামসুল হক সরদার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জমির দখল নিয়ে বিরোধ
অভিযোগে কহিনুর আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী ক্রয়সূত্রে ওই জমির মালিক। প্রায় ১০ বছর ধরে তাঁরা জমিটির খাজনা, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খরচ পরিশোধ করে ভোগদখলে ছিলেন। জমিতে একটি টিনশেড ঘরও ছিল। ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রায় এক বছর আগে ঘরটি ভেঙে জমিটি টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়।
তাঁর অভিযোগ, পরে ইকবাল হোসেন ওই জমিতে মালিকানা দাবি করে এক রাতে সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস হলেও সমাধান হয়নি। বরং রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে জমি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁর স্বামী আদালতের আশ্রয় নেন। কহিনুরের দাবি, আদালত উভয় পক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছেন।
সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সংঘর্ষ
বুধবার ওই জমি সরেজমিন তদন্তের দিন ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কাশেম মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিল্টন রায় ঘটনাস্থলে তদন্ত করছিলেন।
কহিনুরের অভিযোগ, ওই সময় ইকবাল হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। একপর্যায়ে কাশেম মোল্লার ওপর হামলা চালানো হয়। তাঁকে রক্ষা করতে গেলে তাঁর স্ত্রীকেও মারধর করা হয়।
চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ইকবাল ও তাঁর সহযোগীরা পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর লাশ গুমের হুমকি দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে স্থানীয় লোকজন আহত কাশেম মোল্লাকে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে অবস্থিত ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান।
ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে ভূমি কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, তিনি পরিস্থিতি থামানোর চেষ্টা করেছেন। দুই পক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র পাওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
ভিডিওতে থাপ্পড়ের দৃশ্য
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সিয়াম মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে ইকবাল হোসেন তাঁকে থাপ্পড় মারেন।
এ বিষয়ে ইকবাল হোসেন জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, জমিটি অন্য পক্ষ দখলে রেখেছিল। আর ভিডিও ধারণ করার কারণে তিনি ওই যুবককে থাপ্পড় দিয়েছেন।
একের পর এক অভিযোগের প্রেক্ষাপট
রঘুনাথপুরের সর্বশেষ ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ কি না, নাকি ইকবাল হোসেনকে ঘিরে জমি ও প্রভাব বিস্তারসংক্রান্ত অভিযোগের ধারাবাহিকতার অংশ—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
চলতি বছরের ৪ জুন সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড মিতালী মার্কেট এলাকায় এক ব্যবসায়ীর জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেন চৌরাঙ্গী গ্রুপের স্বত্বাধিকারী কাজী আব্দুস সাত্তার। ওই অভিযোগেও ইকবাল হোসেনের নাম আসে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় আদালতে ইকবাল হোসেনসহ কয়েকজনকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের আসিয়ান পরিবহনের একটি বাসের চালককে মারধর ও বাস ভাঙচুরের অভিযোগও ইকবাল হোসেন ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক মিনহাজ আমান লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ করেন।
ওই ঘটনার পর ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ইকবাল হোসেনকে দলের প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। বিএনপির নিজস্ব বিজ্ঞপ্তিতে সাংবাদিক মিনহাজ আমানকে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে আঘাত ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগকে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে প্রায় ১১ মাস পর তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের খবরও প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন এখন তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার
একজন সরকারি ভূমি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, জমির মালিকানা নিয়ে চলমান বিরোধ এবং হত্যার পর লাশ গুমের হুমকির অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন কেবল দুই পক্ষের জমি বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে যদি হামলার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেখানে কারা হামলায় অংশ নিয়েছিল, কার নির্দেশে বা নেতৃত্বে তারা এসেছিল এবং অভিযোগে উল্লেখ করা অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে—এসবের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না।
একই সঙ্গে জমিটির প্রকৃত মালিকানা, আদালতের নিষেধাজ্ঞার সঠিক পরিধি এবং উভয় পক্ষের দাখিল করা দলিলপত্র যাচাই করাও জরুরি। কারণ জমির মালিকানা নির্ধারণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়ার; রাজনৈতিক পরিচয় বা স্থানীয় প্রভাব কোনো পক্ষের জমির অধিকার নির্ধারণ করতে পারে না।
এখন দেখার বিষয়, ফতুল্লা থানা পুলিশের তদন্ত এবং ভূমি কার্যালয়ের সরেজমিন তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—সেটিই ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের প্রধান প্রত্যাশা।









Discussion about this post