নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ফতুল্লায় চাচীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরকীয়া, চাচাকে হত্যার হুমকি এবং শেষ পর্যন্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ড—এই ভয়ংকর ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রাসেল মাহমুদ আবারও আলোচনায় এসেছেন।
হত্যা মামলায় কারাগারে থাকার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। তার পেছনে শক্তি জোগাচ্ছেন নানাভাবে আলোচিত সমালোচিত ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী হাতেম—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
জানা যায়, চাচীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জেরে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের হাতে একবার হাতেনাতে ধরা পড়েন রাসেল মাহমুদ। তখন মারধরে গুরুতর আহত হয়ে প্রকাশ্যেই প্রতিজ্ঞা করেন—চাচাকে হত্যা করে চাচীকে বিয়ে করবেন ই। পরে সেই প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়ন করতেই চাচাকে হত্যা করে চাচীকে বিয়ে করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে চাচাতো বোন, চাচীসহ কারাগারে যান রাসেল।
দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান রাসেল মাহমুদ। মুক্তির পরপরই ফের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফতুল্লার বিসিক শিল্পাঞ্চলে গার্মেন্টস ওয়েস্টেজ বা ‘ঝুট’ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে রাসেল একটি সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
এই ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে অল্প সময়েই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছেন তিনি। ক্ষমতার দাপটে আইন-কানুনকে তোয়াক্কা না করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো সিন্ডিকেটের মূল শক্তি হিসেবে রয়েছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী হাতেম।
তার ছত্রছায়ায় থেকেই রাসেল ও তার সহযোগীরা ফতুল্লার বিসিক এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে।
হাতেমের প্রভাবের কারণেই দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এই চক্র—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনকে অবরুদ্ধ করার ঘটনায় আবারও আলোচনায় আসেন রাসেল মাহমুদ।
গত ৩ মার্চ ফতুল্লার এক ইফতার অনুষ্ঠানে বিকেএমইএ’র সভাপতি হাতেমকে “ফ্যাসিস্ট” আখ্যা দেন এমপি আল আমিন। এর জেরে হাতেমের নির্দেশে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রাসেল মাহমুদ এমপিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ সময় রাসেলের অনুসারীরা এমপি আল আমিনকে হাতেমের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি তোলে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এমপিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
এর আগেও বিসিক শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে রাসেল গ্রুপ। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই ২৯ আগস্ট বিসিক এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফতুল্লার বিসিক ২ নম্বর গেট সংলগ্ন ৩ নম্বর গলিতে ‘মার্টিন নিট ওয়্যার’ ও ‘বিশাল নিট ওয়্যার’-এর সামনে এই সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়।
এরপরও একাধিকবার ঝুট ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এমপিকে অবরুদ্ধ করার ঘটনার পর বিসিকের ঝুট সেক্টরকে কেন্দ্র করে আবারও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। এতে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, হত্যা মামলার আসামি হয়েও জামিনে বেরিয়ে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো এবং একজন সংসদ সদস্যকে অবরুদ্ধ করার মতো দুঃসাহসিক ঘটনা প্রমাণ করে—ফতুল্লায় একটি প্রভাবশালী সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে।
তাদের মতে, রাসেল-হাতেম চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বিসিক শিল্পাঞ্চলে আবারও বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।









Discussion about this post