স্টাফ রিপোর্টার | নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের পদায়নকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তার এই পদায়ন হয়েছে এবং দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট।
‘২০ লাখ টাকা দিয়ে পোস্টিং’—নিজ মুখেই স্বীকারোক্তি !
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া এলাকার সুগন্ধা প্লাস রেস্টুরেন্টের দ্বিতীয় তলায় বসে কয়েকজন ভূমি ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপকালে দুলাল চন্দ্র দেবনাথ দম্ভের সাথে বলেন—
“আমি ২০ লাখ টাকা দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জে পোস্টিং নিয়েছি। আরও অনেক টাকা দিতে হচ্ছে। এই টাকা কি আমি বাবার জমি বেচে আনবো?”
এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ দালাল হিসেবে পরিচিত সুজন, যিনি ক্রসফায়ারে নিহত টাওয়ার সেলিমের ভাগিনা বলে জানা গেছে। ওই বৈঠকে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঘটনার একাধিক ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করেছে একটি স্থানীয় গণমাধ্যম। একই সাথে সুগন্ধা প্লাস রেস্টুরেন্টের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দেখলেই বেরিয়ে আসবে পূর্ণাঙ্গ চিত্র।
সংবাদ বন্ধে ঘুষের প্রস্তাব !
অভিযোগ রয়েছে, এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে দুলাল চন্দ্র দেবনাথ ও তার সহযোগী সুজন এই প্রতিবেদককে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। এমনকি তারা অনুরোধ-অনুনয় করে প্রতিবেদকের কাছে হাত-পা ধরেন বলেও জানা গেছে। এ ঘটনার টাকা দিয়ে সংবাদ বন্ধ করার প্রাণপণ চেষ্টার ভিডিও প্রমাণও সংরক্ষিত রয়েছে নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট এর কার্যালয়ে।
পূর্বের বিতর্কিত রেকর্ড, তবুও পুনরায় পদায়ন
দুলাল চন্দ্র দেবনাথ এর আগে গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ, হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ ছাড়াও অসংখ্য নারী কেলেংকারী ও স্ত্রী হত্যার ঘটনায় কারাগারে থাকায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন। স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আবারও তাকে সিদ্ধিরগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়—যা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তাকে প্রায় ২০ লাখ টাকা দিয়ে এই পদায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ৭ মার্চ মধ্য রাতে এক কর্মকর্তার ডাকবাংলা থেকে দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে বের হতে দেখা গেছে—যা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
এ সময় দুলাল চন্দ্র দেবনাথ ২০ লাখ টাকা লেনদেনের ব্যাপক অভিযোগ ছিল। প্রতিবেদকের সাথে ওই ডাক বাংলার গেইটে দেখা হওয়ার পর মধ্যরাতের নানাভাবে হাতে পায়ে ধরার চেষ্টা করে দুলাল। ওই ডাক বাংলার সিসি ক্যামেরার যাচাই করলে বেরিয়ে আসবে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের ঘুষ কেলেঙ্কারির চিত্র।
দালাল ছাড়া চলে না ভূমি অফিস !
নিজেই স্বীকার করেছেন—
“দালাল ছাড়া ভূমি অফিস চলে না।”
এমন বক্তব্যের পরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে অফিসের কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র। অভিযোগ অনুযায়ী—
# নামজারি, খারিজসহ অধিকাংশ কাজ দালালের মাধ্যমে করতে হয়
# সরাসরি কর্মকর্তার কাছে গেলে নানা ভুল ধরে হয়রানি করা হয়
# পরে দালালের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কাজ সম্পন্ন করতে বাধ্য হন সেবাগ্রহীতারা
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ: ‘টাকা ছাড়া সেবা নেই’
সিদ্ধিরগঞ্জ ও গোদনাইল এলাকার একাধিক ভুক্তভোগী জানান—
# “দুলাল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হয়রানি বেড়েছে”
# “দালাল ছাড়া কোনো কাজ হয় না”
# “ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়”
এমনকি অতীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আগেও বিতাড়িত, তবুও প্রভাবশালী !
ফতুল্লার একটি ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে স্থানীয়রা। একপর্যায়ে জনরোষের মুখে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে গোদনাইলেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে।
প্রশাসনের বক্তব্য
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানিয়েছেন—
“কোনো ভূমি অফিসে দালাল বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালমুক্ত ভূমি অফিস গড়ে তোলা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি
এলাকাবাসীর জোর দাবি—
# দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ তদন্ত করতে হবে
# ঘুষ ও অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে
# সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসে সৎ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাকে পদায়ন করতে হবে
উপসংহার
সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসে দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়—বরং পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ভিডিও প্রমাণ, স্থানীয়দের অভিযোগ এবং তার নিজের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি রাখে।









Discussion about this post