নগর প্রতিনিধি :
শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এক মাসে ১৮টি ডাকাতি, পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র ছিনতাই এবং মহাসড়কে ‘ডিবি পরিচয়ে’ লুটপাট—সব মিলিয়ে জেলাজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা করতেও অনীহা প্রকাশ করছেন।
এক মাসে ১৮ ডাকাতি: বেপরোয়া সশস্ত্র চক্র
২৬ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল—এই ৩০ দিনে জেলার পাঁচটি উপজেলায় অন্তত ১৮টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। আড়াইহাজার, সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকায় মুখোশধারী সশস্ত্র ডাকাতদের তাণ্ডব সবচেয়ে বেশি।
বিশেষ করে আড়াইহাজারে এক মাসে ১০টির বেশি বাড়িতে হানা দেয় ডাকাতরা। ৮ এপ্রিল বিশনন্দী ইউনিয়নে এক রাতেই তিনটি বাড়িতে হামলা চালানো হয়।
এছাড়া ফতুল্লায় এক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে কোটি টাকার মালামাল লুট এবং সোনারগাঁয়ে ফিল্মি কায়দায় নগদ ডিস্ট্রিবিউটর সেন্টার থেকে ৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
মহাসড়ক এখন ‘মৃত্যুকূপ’
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোও এখন নিরাপদ নয়। ২১ এপ্রিল ভোরে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে প্রবাস ফেরত নারী হিমু আক্তারের গাড়ি থামিয়ে ৬ ভরি স্বর্ণ লুট করা হয়।
সর্বশেষ আজ ৫ মে ভোরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে একই কায়দায় মালয়েশিয়া প্রবাসী আব্দুল মালেকের কাছ থেকে সাড়ে আট ভরি স্বর্ণ ছিনতাই করা হয়েছে।
মামলা করতে ভয়: পুলিশের ওপর অনাস্থা
অবস্থার ভয়াবহ দিক হলো—ভুক্তভোগীদের বড় অংশই থানায় মামলা করতে চাইছেন না। হয়রানি, সময়ক্ষেপণ ও বিচার না পাওয়ার আশঙ্কাই এর প্রধান কারণ।
এক ভুক্তভোগীর ভাষায়, “মামলা করে লাভ নেই, উল্টো হয়রানি বাড়ে”—এই ধারণা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত।
থানাই অনিরাপদ : পুলিশের বাইক চুরি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিজস্ব নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গত দুই বছরে অন্তত পাঁচটি মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি থানার ভেতর থেকেই।
পুলিশ সদস্যরাই যখন নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে পারছেন না, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে—তা সহজেই অনুমেয়।
পুলিশের ওপর হামলা ও অস্ত্র ছিনতাই
পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা ও অস্ত্র ছিনতাই।
৩০ এপ্রিল বন্দর এলাকায় অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয় পুলিশ। এসময় একটি সরকারি শর্টগান ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং দুই পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে জখম করা হয়।
এর আগে ৯ মার্চ শহরের নিতাইগঞ্জে এক এএসআইয়ের পিস্তল ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে।
অপরাধের নেপথ্যে কী ?
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক বিস্তার, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান—এসব কারণেই অপরাধ বেড়েছে। কিশোর অপরাধীরা অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত এবং তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
পুলিশের বক্তব্য বনাম বাস্তবতা
পুলিশের দাবি—গত মাসে ডাকাতির ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আগেই অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না। এমনকি জেলার পুলিশ সুপার নিজেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনার বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন—যা পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।
উপসংহার
সবকিছু মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ এখন কার্যত অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি থেকে শুরু করে পুলিশের অস্ত্র ছিনতাই—এমন ধারাবাহিক ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
দ্রুত, কার্যকর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।








Discussion about this post