স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় পদ্মা রেল সেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি কাটার ঘটনায় ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
অভিযোগ উঠেছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে নিয়ে বিক্রি করছে, যা সরাসরি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এ ঘটনায় ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় পিলারের নিচ থেকে মাটি অপসারণ করা হচ্ছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে এবং শুরু হয় নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক এক ইউনিয়ন মেম্বার আবুবক্কর ও তার সহযোগীরা এই মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত।
তারা নাকি সেনাবাহিনীর একটি কথিত অনুমতির কাগজ দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পিলারের গোড়া থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, “এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই মাটি কাটার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম অসামঞ্জস্যতা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভাইরাল ভিডিওটি জেলা প্রশাসকের নজরে আসার পর তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
এর প্রেক্ষিতে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম ফয়েজ উদ্দিন ঘটনাস্থলে সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে পাঠান।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা একটি ‘ওয়ার্ক অর্ডার’ দেখাচ্ছেন।
তাদের দাবি, চায়না নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এই কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এটি প্রকল্পের অংশ। তবে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় আপাতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
রেলওয়ের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা স্পষ্টভাবে জানান, “বাংলাদেশ রেলওয়ে কখনোই এ ধরনের মাটি কাটার অনুমোদন দেয় না। আমরা এমন কোনো অনুমতি দেইনি। যদি কেউ কাগজ দেখিয়ে থাকে, তা যাচাই করা জরুরি—এটি ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো অনুমোদন না থাকে, তাহলে কার ছত্রছায়ায় এমন স্পর্শকাতর স্থাপনার নিচ থেকে মাটি কাটা হচ্ছে? আর যদি অনুমোদন থেকে থাকে, তবে কেন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো তা সম্পর্কে অবগত নয় ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি অপসারণ করা হলে তা কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ—যা নিয়ে এমন অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বর্তমানে প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে তদন্তের কথা বললেও, স্থানীয়দের দাবি—শুধু তদন্ত নয়, দ্রুত দায়ীদের শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একটি জাতীয় সম্পদকে ঘিরে এমন দায়িত্বহীনতা ও অস্পষ্টতা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন কেবল কাগজে-কলমে পদক্ষেপ নেয়, নাকি বাস্তবেই দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।









Discussion about this post