মন্ত্রিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিতর্কিত ব্যক্তির ভবন উদ্বোধন—আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে চরম প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, তারই এক নগ্ন উদাহরণ হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক এক ঘটনা।
একটি হত্যা মামলার আসামি হয়েও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়ানো এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার ঘটনায় জেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড়।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মেট্রো গ্রুপের কর্ণধার হিসেবে পরিচিত অমল পোদ্দার (৫৫)।
তার বিরুদ্ধে সোনারগাঁ থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং: ১৭(১০)২৪) দায়ের থাকলেও, বাস্তবে তাকে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত ভূমিকায়—একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে।
গত শনিবার (১৩ জুন) সোনারগাঁ উপজেলার পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘বিশ্বেশ্বর পোদ্দার’ নামে একটি নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, এমপি, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার ওসি’র উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
অথচ এই অনুষ্ঠানটির আয়োজক হিসেবে সামনে ছিলেন সেই অমল পোদ্দার—যার বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন।

এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি প্রভাবশালীদের জন্য আলাদা ?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকায় দালাল হিসেবে পরিচিত অমল পোদ্দার নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান।
বিশেষ করে শ্বশুর কাঁলাচান রায়ের সম্পত্তি দখলসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আইনের আওতার বাইরে রেখেছেন।
এছাড়াও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। শ্বশুরের একমাত্র কন্যাকে বিয়ে করে সম্পদের মালিকানা দখল এবং পরে স্ত্রী-সন্তানদের আলাদা রেখে নিজে নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—যার পিতার নামে কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পদ বা সামাজিক অবস্থান ছিল না, সেই ‘বিশ্বেশ্বর পোদ্দার’ নামেই একটি ভবন নির্মাণ ও উদ্বোধন করা হয়েছে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে।
যা জনমনে আরও গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন সোনারগাঁয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
একই মঞ্চে জাতীয় সংসদের হুইপ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে পুরো আয়োজন ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল অমল পোদ্দারের ভূমিকা।
আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি হত্যা মামলার আসামি যদি প্রকাশ্যে এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং প্রশাসনের উপস্থিতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে তা দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত।
স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ দাবি করেছেন।
অন্যথায়, এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

শেষ কথা—
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে এমন ‘অমল পোদ্দারদের’ দাপটই হয়ে উঠবে নতুন বাস্তবতা—যেখানে অপরাধীই হবে ক্ষমতার প্রতীক, আর সাধারণ মানুষ থাকবে নীরব দর্শক।









Discussion about this post