২৫ বছরেও শেষ হয়নি চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলা মামলার বিচার
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভয়াবহ বোমা হামলার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি মামলার বিচারকাজ। ২০০১ সালের ১৬ জুন সংঘটিত ওই হামলায় ২০ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।
দীর্ঘ সময়েও বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। তারা দ্রুত বিচার শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
অভিযোগপত্রে ১০৩ জনকে সাক্ষী করা হলেও এ পর্যন্ত বাদীসহ মাত্র ২২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিচারকাজ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) বলেন, “মামলাটি অনেক আগেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ছিল। বর্তমানে এটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ময়নাতদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা গেলে বিচারকাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগবে না।”
তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যদি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে না-ও থাকে, তবে আদালতের কাছে থাকা ফটোকপি সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সত্যায়ন করে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
পিপির ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও অনেকেই আদালতে হাজির হননি। ইতোমধ্যে অনেক সাক্ষী মারা গেছেন, অনেকের ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে এবং কেউ কেউ অবসরে গেছেন। এসব কারণেই বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে।
২০১৩ সালে অভিযোগপত্র, বিচার এখনো অসম্পূর্ণ
বোমা হামলার ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি ২০১৩ সালের ২ মে পৃথক দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন
হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন তৎকালীন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শাহাদাৎউল্লাহ জুয়েল (ভল্টন জুয়েল), হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, হুজি সদস্য দুই ভাই আনিসুল মোরসালীন ও মাহবুবুল মুত্তাকিন, উত্তর চাষাঢ়ার বাসিন্দা ওবায়দুল হক এবং বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকু।
তাদের মধ্যে মুফতি আবদুল হান্নানের ফাঁসি ইতোমধ্যে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় কার্যকর হয়েছে। শাহাদাৎউল্লাহ জুয়েল বর্তমানে কারাগারে আছেন।
আনিসুল মোরসালীন ও মাহবুবুল মুত্তাকিন ভারতের কারাগারে আটক রয়েছেন। ওবায়দুল হক দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং শওকত হাশেম শকু উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।
স্বজনদের ক্ষোভ ও বেদনা
হামলায় নিহত নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের সাবেক জিএস আক্তার হোসেনের স্ত্রী সোহানা আক্তার বলেন, “দেশে অনেক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। কিন্তু এই বোমা হামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে আছে। আমরা দোষীদের বিচার ও শাস্তি চাই।”
স্বামীকে হারানোর স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচার না হওয়ায় নিহতদের পরিবারগুলো মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী হামিদা ইসলামও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কীভাবে বেঁচে আছি, তা বলে বোঝাতে পারব না। নিহতদের পরিবারগুলো কীভাবে চলছে, সরকারের তা দেখা উচিত।”
এদিকে হামলায় গুরুতর আহত হয়ে দুই পা হারিয়েছেন যুবলীগ নেতা রতন দাস এবং তৎকালীন কৃষক লীগ নেতা চন্দন শীল। আহতদের অনেকেই এখনো শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন।
ভয়াবহ সেই হামলা
২০০১ সালের ১৬ জুন রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত গণসংযোগ কর্মসূচি চলাকালে বোমা হামলা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ২০ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ।
ঘটনার পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ ২৫ বছর পরও বিচার শেষ না হওয়ায় নিহত ও আহতদের স্বজনরা দ্রুত সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করে মামলার নিষ্পত্তি এবং দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া।









Discussion about this post