রূপগঞ্জে ‘জিন তাড়ানো’র নামে নির্যাতন: কুসংস্কার না কি সংগঠিত নির্লজ্জতা ?
রূপগঞ্জ প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর ‘জিন ভর’–এর গল্প ছড়িয়ে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। জিন তাড়ানোর নামে বেত্রাঘাত, মানসিক অত্যাচার ও অপচিকিৎসার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ, নাকি পরিকল্পিত নির্যাতনের এক নোংরা রূপ ?
উপজেলার গোলাকান্দাইল এলাকার তালিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসায় গত কয়েকদিন ধরে ১৩-১৪ জন শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ‘জিন তাড়ানোর নাটক’। অসুস্থ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার বদলে তাদের ওপর চালানো হয় বেত্রাঘাত ও মানসিক নির্যাতন—যা আধুনিক যুগে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এ ঘটনায় শুধু মাদ্রাসা নয়, আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন, শিক্ষার্থীরা ভীত—কেউ ঠিকমতো ক্লাস করতে পারছে না, এমনকি ভয় পেয়ে অনেকেই মাদ্রাসা ছেড়ে দিচ্ছে।
ঘটনাটিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে পাশের নূরে মদিনা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসাকে জড়িয়ে তোলা অভিযোগ। তালিমুল কুরআন মাদ্রাসার এক শিক্ষক দাবি করেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের মাধ্যমে ‘জিন চালান’ করা হয়েছে। পাল্টা অভিযোগে ওই প্রিন্সিপাল একে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও কাল্পনিক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করে দোষারোপের এক অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে—যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে তিনজন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসার আওতায় আনার বদলে কুসংস্কারের আশ্রয় নেওয়া হয়। ধীরে ধীরে সেটিই ভয়াবহ রূপ নেয়। অনেকেই এটিকে ‘জিন তাড়ানোর নামে সাজানো নাটক’ বলেও সন্দেহ করছেন।
চিকিৎসকরা স্পষ্ট করে বলেছেন—এ ধরনের আচরণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে, যার যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু সেই বৈজ্ঞানিক পথ এড়িয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে, যা শুধু অমানবিকই নয়, অপরাধও বটে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। শিক্ষা কর্মকর্তারা তদন্তের আশ্বাস দিলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার পরও কেন তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না ?
সচেতন মহলের মতে, ‘জিন তাড়ানো’র নামে এই ধরনের নির্যাতন বন্ধে এখনই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি অজ্ঞতা, কুসংস্কার আর নির্যাতনই জায়গা করে নেয়, তবে সেই শিক্ষা কাদের জন্য ?
এখন সময় স্পষ্ট সিদ্ধান্তের—শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, নাকি কুসংস্কারের আড়ালে নির্যাতন চলতেই থাকবে ?









Discussion about this post