চাষাড়ায় পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার : অভিযোগ, ব্যাখ্যা ও প্রশ্নের মুখে চিকিৎসাসেবা
নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাড়ায় অবস্থিত পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে একটি শিশুর চিকিৎসা-সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
একদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের অবহেলা ও অদক্ষতার অভিযোগ, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সব অভিযোগ অস্বীকার—দুই বিপরীতমুখী অবস্থান ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে জনমনে প্রশ্ন।
শিশু রাইয়ানের ঘটনা : অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু
১৬ মাস বয়সী শিশু রাইয়ানকে একটি সাধারণ সমস্যার চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠানে রক্ত নেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, অদক্ষ কর্মীদের একাধিকবার সূঁচ প্রয়োগের ফলে শিশুটির হাতে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়, যা পরে ঢাকায় নিয়ে জরুরি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।
পরিবারের দাবি, এ ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এমন অপকর্ম ধামাচাপা দিতে এবার মাঠে নেমেছে একাধিক দালাল চক্র :
শিশুটিকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখানে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, রক্ত নেওয়ার সময় গুরুতর ক্ষতির কারণে হাতের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের পরামর্শে শিশুটির জরুরি অপারেশন করা হয়। বর্তমানে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে । এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকগণ শিশুটির এমন অবস্থার জন্য পপুলার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অদক্ষদের দায়ী করে মন্তব্য করেছেন বলেও শিশুর পরিবার মন্তব্য করে বিচার দাবী করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এরপর শুরু হয় পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দৌড়ঝাপ ও দালালদের দিয়ে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা ।
প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যাঃ ‘অপপ্রচার’ ও পূর্ববর্তী রোগের দাবি
অন্যদিকে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, শিশুটির চিকিৎসা যথাযথ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। তাদের দাবি, শিশুটি ‘সেলুলাইটিস’ নামক একটি প্রদাহজনিত সমস্যায় ভুগছিল, যা রক্ত নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে এবং বাস্তবে শিশুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
দুই পক্ষের বিপরীত বক্তব্যে প্রশ্ন
একই ঘটনায় দুই ধরনের সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা জনমনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—
# যদি চিকিৎসা সঠিকভাবে হয়ে থাকে, তবে রক্ত নেওয়ার পরপরই হাত ফুলে যাওয়ার ঘটনা কেন ঘটল?
# আবার যদি অবহেলা হয়ে থাকে, তবে সেটির দায় নির্ধারণে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই কেন?
‘ম্যানেজ সংস্কৃতি’ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী—
বিভিন্ন পেশাজীবী ও প্রভাবশালীদের মাসোয়ারা বা সুবিধা প্রদান,
# আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা,
# এবং প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়—এসব কারণে অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে এলেও কার্যকর তদন্ত বা ব্যবস্থা দেখা যায় না।
এমনকি একটি বিশেষ শ্রেণীর সামাজিক ক্লাবের সদস্যদের বিরুদ্ধেও মাসিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তুলে স্থানীয়রা বলছেন, “সবাই জানে, কিন্তু কেউ বলে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
নগরীর কয়েকজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ ধরনের ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে। রক্ত নেওয়ার মতো সাধারণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হওয়া বিরল হলেও অসম্ভব নয়—তবে সেটি দক্ষতার ঘাটতি বা অবহেলার কারণে হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হবে।”
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলেও কেন কার্যকর তদন্ত বা জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না—এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
উপসংহার
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অভিযোগ কিংবা একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার মান, জবাবদিহিতা এবং প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা—
একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কারণ, চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি জীবনের নিরাপত্তাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।









Discussion about this post