নাসিরকে ঘিরে বিতর্ক, কিন্তু ভাষার আগুনে জ্বলছে রাজনীতি: নারায়ণগঞ্জে বিএনপির মিছিলে প্রকাশ্য সহিংস হুমকি
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বিতর্কিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যে উত্তাপ ছড়িয়েছে, তা এখন আর শুধুমাত্র প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—বরং তা রূপ নিয়েছে প্রকাশ্য সহিংস হুমকি, প্রতিহিংসাপূর্ণ ভাষা এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার নগ্ন প্রদর্শনীতে।
গত কয়েক দিনে নারায়ণগঞ্জে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।
বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে এনসিপির উদ্দেশ্যে যে ভাষায় হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক শিষ্টাচার তো দূরের কথা, ন্যূনতম মানবিক সীমাও অতিক্রম করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি “৫ মিনিটে মোকাবেলা” এবং “তেলাপোকার মতো পিষে মারার” মতো উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিএনপির মিছিল আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
রোববার রাতে সাবেক এক ছাত্রদল নেতার উদ্যোগে বের হওয়া বিক্ষোভ মিছিল থেকে সরাসরি “জবাই করার” স্লোগান দেওয়া হয়।
পরদিন সোমবার মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও এমপিপুত্র আবুল কাউসার আশার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মিছিল থেকেও একই ধরনের ভয়াবহ স্লোগান শোনা যায়—“এনসিপির চামড়া তুলে নেব”—যা নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং স্পষ্ট সহিংসতার আহ্বান।
এর আগের দিন রোববার মহানগর ছাত্রদলের সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান, জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীবের পক্ষে একটি মিছিল বের করেন। প্রায় ত্রিশ জনের সেই মিছিল থেকে উচ্চারিত হয় চরম উদ্বেগজনক স্লোগান—“একটা একটা এনসিপি ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”। এমন স্লোগান দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
যদিও এই ঘটনার পর মাশুকুল ইসলাম রাজীব তার ছবি ব্যবহার করে অননুমোদিত কর্মসূচি পালন না করার আহ্বান জানান, তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দলের ভেতরে এমন উগ্রতা কেন এবং কীভাবে বিস্তার লাভ করছে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অতীতে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এমন নির্মম ভাষা খুব একটা শোনা যায়নি বিএনপির মিছিলে। সেখানে সাধারণত “লীগ ধর, জেলে ভর”—এর মতো স্লোগানেই সীমাবদ্ধ ছিল প্রতিবাদ। কিন্তু বর্তমানে তুলনামূলক ছোট দল এনসিপির বিরুদ্ধে “জবাই” ও “চামড়া তোলার” মতো সহিংস আহ্বান বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান ও মানসিকতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্য নিঃসন্দেহে সমালোচনার দাবি রাখে। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি নেতাদের যে ভাষা ব্যবহার করছেন, তা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। তারা কেবল নাসিরের বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন না—বরং সেই সীমা অতিক্রম করে নিজেরাই সহিংস ও অশালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠছেন।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা—রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা যদি “জবাই” আর “চামড়া তুলে নেওয়ার” ভাষায় প্রকাশ পায়, তবে সেটি আর গণতন্ত্র নয়, বরং ভয় ও সহিংসতার রাজনীতি।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রতি আহ্বান—সংযত ভাষায় রাজনৈতিক বিরোধিতা করা এবং কর্মীদের লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এই ভাষার আগুনই একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।









Discussion about this post