নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা নেতাকর্মীদের ত্যাগ, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের ইতিহাস যখন বিএনপির রাজনীতির অন্যতম বড় পুঁজি, তখন নারায়ণগঞ্জের বন্দরে দলটির নেতৃত্বে শাহেন শাহ আহম্মেদের উত্থানকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, পরবর্তী সময়ে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া এবং স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব বিস্তার নিয়ে দলের তৃণমূলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বর্তমানে শাহেন শাহ আহম্মেদ বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি। ২০২৩ সালের ৯ জুন অনুষ্ঠিত বন্দর থানা বিএনপির সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন—এ তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে এসেছে।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক অতীত নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলছেন দলের দীর্ঘদিনের নেতাকর্মীদের একটি অংশ। স্থানীয় একটি প্রতিবেদনে তাঁকে অতীতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে দাবি করা হয় এবং বন্দর থানা বিএনপির কমিটি গঠন নিয়েও নানা অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
একই প্রতিবেদনে কমিটি বাণিজ্য ও পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও বিএনপি নেতা আবু আল ইউসুফ খান টিপু এসব অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
‘ত্যাগীদের বাদ দিয়ে সুবিধাভোগীদের উত্থান?’
বিএনপির মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা নেতাকর্মীদের অভিযোগ—আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখনো কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পাননি। অথচ রাজনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক সময়ে সামনে আসা কিছু নেতা গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পেয়ে যাচ্ছেন।
এই অভিযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যও পাওয়া যায় বিএনপির মহানগর নেতৃত্বের কাছ থেকে। এক অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, যারা দীর্ঘ ১৫ বছর আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন করাই দলের লক্ষ্য।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—দলের ঘোষিত নীতি যদি ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন হয়, তাহলে বন্দরে নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সেই নীতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
২০২৩ সালেই বিতর্কের সূত্রপাত
শাহেন শাহের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালে বন্দর থানা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তাঁকে ঘিরে ‘নৌকা-লাঙ্গল মার্কা’ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে তাঁর অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে প্রশ্ন থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ ওই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি এবং দলীয় নেতারাও অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের পর্যায়েই রয়েছে।
আন্দোলনের রাজনীতি থেকে পদ-পদবির রাজনীতি ?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শাহেন শাহকে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে দেখা যায়। ২০২৪ সালের নভেম্বরের একটি প্রতিবেদনে তাঁকে বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়।
এর পর থেকে বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি নিয়মিত। এমনকি ২০২৫ সালে ১৫ আগস্ট ঘিরে বন্দর থানা যুবদলের অবস্থান কর্মসূচিও তাঁর নির্দেশনায় হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
অর্থাৎ, ২০২৪-পরবর্তী সময়ে রাজপথে তাঁর সক্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সক্রিয়তা কি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকার ধারাবাহিকতা, নাকি রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন করে দৃশ্যমান হওয়া?
‘অপরাধ সাম্রাজ্য’র অভিযোগ—প্রমাণ কোথায় ?
শাহেন শাহকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ও সমালোচনা থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে ‘ওসমান পরিবারের আশীর্বাদে অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা’ বা নির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে ২০২৪ সালের একটি মামলার প্রতিবেদনে বন্দর বিএনপি নেতা শাহেন শাহের নাম আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। মামলাটি রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপটে দায়ের হয়েছিল বলে দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। ফলে শুধু মামলায় নাম থাকাকে অপরাধ প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এখানেই অনুসন্ধানের মূল জায়গা—শাহেন শাহের বিরুদ্ধে যদি সত্যিই দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকে, সেসবের পেছনে মামলা, জিডি, আদালতের নথি, প্রশাসনিক তদন্ত, ভুক্তভোগীর বক্তব্য কিংবা প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে কি না, সেটিই যাচাই করা জরুরি।
‘সাব্বাস শাহেন শাহ’—নাকি ত্যাগীদের বঞ্চনার প্রতীক ?
একদিকে বিএনপির নেতৃত্ব প্রকাশ্যে বলছে, দলের দুঃসময়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। অন্যদিকে বন্দরের তৃণমূলের একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের পাশ কাটিয়ে বিতর্কিত অতীতের নেতারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন।
এই দ্বন্দ্বই এখন বন্দরের বিএনপির রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
# শাহেন শাহ আহম্মেদ যদি অতীতে আওয়ামী লীগ বা অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে থাকেন, তাহলে সেই সময় তাঁর ভূমিকা কী ছিল ?
# তিনি যদি কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক সুবিধা নিয়ে থাকেন, তার নথি কোথায় ?
# ওসমান পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অভিযোগের ভিত্তি কী ?
# আর যদি এসব অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলে সেগুলোর বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান কী ?
এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি শুধু শাহেন শাহের জন্য নয়—বন্দর বিএনপির নেতৃত্বের স্বচ্ছতার জন্যও।
কারণ রাজনীতিতে পদ পাওয়া এক বিষয়, আর দুঃসময়ে দলের পাশে থাকা আরেক বিষয়।
বন্দরের ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রশ্ন তাই সরল—যারা রাজপথে ছিলেন, তারা কোথায়; আর যারা সুবিধাজনক সময়ে সামনে এলেন, তারা এতটা সামনে কীভাবে ?
এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগ নয়, প্রয়োজন নথি, প্রমাণ এবং নিরপেক্ষ অনুসন্ধান।









Discussion about this post