সিআইডির জালে ১০ জন, গ্রেপ্তার হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বাসিন্দাও; তালিকায় রয়েছে বন্দর ও সদরের কুখ্যাত কয়েকজন ! প্রশ্ন উঠছে ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ সেলিম প্রধান ও তার বাহিনীর পুরোনো নেটওয়ার্ক নিয়েও
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
বিদেশি অনলাইন বেটিং সাইট। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এজেন্ট। তাদের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ব্যাংক হিসাব। জুয়ার টাকা সংগ্রহ ও উত্তোলন। কমিশন কেটে নেওয়ার পর সেই অর্থ ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার—পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যে চক্রের সন্ধান পেয়েছে, তার বিস্তার এখন দেশের একাধিক জেলায়।
সর্বশেষ রাজশাহী ও ঝিনাইদহে অভিযান চালিয়ে সৈয়দ জামান (২৭) ও রুহুল কুদ্দুস ওরফে বাপ্পী (২৮) গ্রেপ্তারের পর এই মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০-এ।
সিআইডির দাবি, সৈয়দ জামান রাশিয়া থেকে নিয়ন্ত্রিত একটি অনলাইন জুয়া সাইটের অ্যাডমিন হিসেবে কাজ করতেন। আর রুহুল কুদ্দুস জুয়া সাইটের অর্থ জমা ও উত্তোলন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু এই তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের নামও। কারণ, চক্রটির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে এরই মধ্যে জেলার সোনারগাঁয়, বন্দর ও রূপগঞ্জের কয়েকজন বাসিন্দা গ্রেপ্তার হয়েছেন। আবু জোবায়ের সানি (৩৬) নামের ওই ব্যক্তিকে গত জুনে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তদন্ত সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজের নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম অনলাইন জুয়ার সাইটে সক্রিয় রেখে কমিশন নিতেন।
নারায়ণগঞ্জে ‘এজেন্ট’ নেটওয়ার্কের সন্ধান
সিআইডির প্রকাশিত তদন্ত-তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন বেটিং চক্রটি শুধু একটি বা দুটি সাইটকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের এমএফএস নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করা হতো। এসব হিসাব ব্যবহার করে জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং জুয়ার অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হতো।
এজেন্টরা কমিশন রেখে দিতেন; এরপর অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের আবু জোবায়ের সানিকে গ্রেপ্তারের তথ্যটি তাই আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। কারণ তিনি শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত কেউ নন—সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে তাঁর নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম অনলাইন জুয়ার সাইটে সক্রিয় রাখার এবং এর বিপরীতে কমিশন নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
এখানেই প্রশ্ন—নারায়ণগঞ্জে কি অনলাইন বেটিংয়ের জন্য আলাদা কোনো এজেন্ট নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে ?
সিআইডির প্রকাশ্য তথ্য এখনো এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেনি। তবে নারায়ণগঞ্জের একজন বাসিন্দার গ্রেপ্তার এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের সম্ভাব্য ব্যবহার তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
সেলিম প্রধানের পুরোনো অধ্যায় কি আবার সামনে?
অনলাইন জুয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সেলিম প্রধানের নাম সামনে আসে।
২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া সেলিম প্রধানকে তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসার অন্যতম মূল হোতা হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
তাঁর গুলশান ও বনানীর বাসা-অফিসে অভিযানে বিপুল নগদ টাকা, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, ব্যাংকের চেক, সার্ভার ও ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছিল।
র্যাবের সে সময়ের তথ্য অনুযায়ী, সেলিম প্রধানের পরিচালিত অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবস্থায় খেলোয়াড়দের মোবাইল ব্যাংকিং ও কার্ডের মাধ্যমে টাকা জমা দিতে হতো। একটি গেটওয়েতে এক মাসেই প্রায় ৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছিল র্যাব। তদন্তে অর্থ বিদেশে পাঠানোর অভিযোগও উঠে আসে।
সেলিম প্রধানের পৈতৃক বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা মর্তুজাবাদ এলাকায়। অর্থাৎ দেশের অনলাইন ক্যাসিনোর আলোচিত পুরোনো অধ্যায়ের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের একটি সরাসরি ভৌগোলিক যোগসূত্র রয়েছে।
পরে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের মামলায় আদালত সাজা দেন। ২০২৪ সালে রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করলেও মানি লন্ডারিং ও দুদকের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তাঁর মনোনয়ন বাতিলের আদেশ বহাল থাকে।
তবে বর্তমান সিআইডি যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, তাদের সঙ্গে সেলিম প্রধানের সরাসরি যোগাযোগ বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে—এমন কয়েকজনের তথ্য অংগ্রহে এখন পর্যন্ত তীক্ষ্ণ নজরদারি চালাচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থা।
ফলে তাঁকে বর্তমান চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করার সুযোগ নেই। বরং তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে প্রশ্নটি হচ্ছে—পুরোনো অনলাইন ক্যাসিনো নেটওয়ার্কের কোনো অংশ কি নতুন প্রযুক্তি, নতুন সাইট, নতুন এজেন্ট ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে আবার সক্রিয় হয়েছে ?
পুরোনো মডেল, নতুন প্রযুক্তি
সেলিম প্রধানের সময় অনলাইন ক্যাসিনোর অর্থ লেনদেনে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের তথ্য সামনে এসেছিল। বর্তমান সিআইডি মামলাতেও একই ধরনের আর্থিক অবকাঠামোর সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি যুক্ত হয়েছে।
পার্থক্য হলো—এখন একটি ওয়েবসাইট পরিচালনার জন্য বড় অফিস বা দৃশ্যমান ক্যাসিনো অবকাঠামোর প্রয়োজন নেই। একটি মোবাইল ফোন, নিবন্ধিত এজেন্ট সিম, এমএফএস অ্যাকাউন্ট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই হয়ে উঠতে পারে একটি বিশাল বেটিং নেটওয়ার্কের অংশ।
সিআইডির তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কারও কারও ক্ষেত্রে নিজের নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। আবার অন্যদের কাছ থেকে এজেন্ট সিম সংগ্রহ করে চক্রের কাছে সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।
অর্থাৎ, একটি অনলাইন জুয়া সাইটের পেছনে থাকতে পারে বহু স্তরের দেশীয় এজেন্ট—আর তাদের পেছনে থাকতে পারে বিদেশে অবস্থানকারী নিয়ন্ত্রক বা অপারেটর।
নারায়ণগঞ্জের সানিকে ঘিরে তদন্তের নতুন প্রশ্ন
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁয়ের ভিটি পরমেশ্বরদী এলাকার আবু জোবায়ের সানিকে আড়াইহাজার বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে তাঁর নিজের নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম অনলাইন জুয়ার সাইটে সক্রিয় রাখার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়াও গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছে কয়েকজন তাদের সকল তথ্য রয়েছে গোয়েন্দার হাতে।
এখন তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—
সানির মাধ্যমে আরও কতজন এজেন্ট যুক্ত হয়েছিল ?
তার ব্যবহৃত সিম বা হিসাবের সঙ্গে কোন কোন বেটিং সাইটের যোগাযোগ ছিল ?
কত টাকা লেনদেন হয়েছে এবং কত টাকা বিদেশে গেছে ?
এই লেনদেনে নারায়ণগঞ্জের আর কারা যুক্ত ছিলেন ?
সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ কিংবা ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় এ ধরনের আরও এজেন্ট রয়েছে কি না ?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বর্তমান চক্রের সঙ্গে পুরোনো অনলাইন ক্যাসিনো নেটওয়ার্কের কোনো সাংগঠনিক, আর্থিক বা প্রযুক্তিগত যোগসূত্র আছে কি না।
২৬৮ সাইটের তথ্য, সামনে আরও বড় নেটওয়ার্ক ?
চলতি বছরের জুনে সিআইডির তদন্তে দেশে সক্রিয় ২৬৮টি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। একই সময়ে সংস্থাটি জানায়, এ-সংক্রান্ত অভিযানে একাধিক মামলায় অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, বর্তমান অনলাইন জুয়ার বাজার কোনো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ওয়েবসাইটের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে বিজ্ঞাপনদাতা, সাইট পরিচালনাকারী, স্থানীয় এজেন্ট, এমএফএস ও ব্যাংক হিসাবের মালিক, সিম সরবরাহকারী, অর্থ সংগ্রহকারী এবং বিদেশে থাকা মূল নিয়ন্ত্রকরা।
এই কাঠামোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের একজন এজেন্টের গ্রেপ্তার তদন্তকে জেলার দিকে আরও গভীরভাবে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
সেলিম প্রধানের পরও কি বদলায়নি খেলা ?
২০১৯ সালে সেলিম প্রধানকে ঘিরে যে অনলাইন ক্যাসিনো অধ্যায় সামনে এসেছিল, তার কেন্দ্র ছিল বিদেশভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, দেশীয় অর্থ সংগ্রহ এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর অভিযোগ। সেই সময় র্যাব জানিয়েছিল, সেলিমের অনলাইন ক্যাসিনো কার্যক্রমে ব্যাংক ও মোবাইলভিত্তিক লেনদেন ব্যবহৃত হতো এবং অর্থ বিদেশে পাঠানোর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।
সাত বছর পর সিআইডির বর্তমান তদন্তে আবারও দেখা যাচ্ছে—বিদেশি অনলাইন জুয়ার সাইট, দেশীয় এজেন্ট, এমএফএস, ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির সমন্বয়ে অর্থ সরানোর অভিযোগ।
দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু ব্যবসার কৌশলে যে অদ্ভুত মিল রয়েছে, সেটিই তদন্তের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নারায়ণগঞ্জে সেলিম প্রধানের মতো আলোচিত অনলাইন ক্যাসিনো কারবারির পুরোনো ইতিহাস এবং এবার সোনারগাঁয়ের একজন বাসিন্দার অনলাইন বেটিং–অর্থপাচার মামলায় গ্রেপ্তার—দুটি ঘটনা একই জেলার মাটিতে ঘটলেও এগুলো একই চক্রের অংশ কি না, তার উত্তর এখনো তদন্তের অপেক্ষায়।
তদন্তের আসল জায়গা অর্থের পথ
অনলাইন জুয়ার মামলায় শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ বা এজেন্ট গ্রেপ্তার করলেই নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন। কারণ, একজন এজেন্ট ধরা পড়লেও তার ব্যবহৃত সিম, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, আইপি লগ, ডিভাইস, ক্রিপ্টো ওয়ালেট ও লেনদেনের উৎস অনুসরণ করলেই বেরিয়ে আসতে পারে পুরো নেটওয়ার্কের চিত্র।
সিআইডিও জানিয়েছে, তারা অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী, এজেন্ট, অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত এমএফএস ও ব্যাংক হিসাবের মালিক এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে কাজ করছে।
তাই এখন দেখার বিষয়—নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের গ্রেপ্তার হওয়া এজেন্টের আর্থিক লেনদেনের সূত্র কোথায় গিয়ে মেশে।
সেই সূত্র যদি রূপগঞ্জের পুরোনো অনলাইন ক্যাসিনো অধ্যায়ের দিকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের অনলাইন জুয়ার ইতিহাসের একটি পুরোনো অধ্যায় নতুন প্রমাণ নিয়ে আবার সামনে আসতে পারে। আর যদি সূত্র ভিন্ন কোনো বিদেশি অপারেটরের কাছে পৌঁছে, তাহলে প্রমাণ হবে—সেলিম প্রধানের যুগের পর অনলাইন জুয়ার কারবার কেবল ব্যক্তি বদলে নয়, বরং প্রযুক্তি বদলে আরও বিকেন্দ্রীভূত ও অদৃশ্য হয়েছে।
এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য একটাই—অনলাইন জুয়া এখন শুধু জুয়ার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন, সাইবার অপরাধ এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের ঝুঁকি। আর সেই নেটওয়ার্কের একটি দৃশ্যমান সুতো ইতিমধ্যে এসে ঠেকেছে নারায়ণগঞ্জে।









Discussion about this post