৫ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি, অথচ বিসিকে দুর্ভোগের সাম্রাজ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি। কর্মসংস্থান প্রায় আড়াই থেকে পৌনে তিন লাখ মানুষের। শত শত কারখানায় দিন-রাত উৎপাদন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বিসিক হোসিয়ারি শিল্পনগরী। অথচ এই শিল্পাঞ্চলে ঢুকলেই মনে হয়—এটি যেন বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কোনো শিল্পকেন্দ্র নয়, বরং বছরের পর বছর অবহেলা, অনিয়ম ও প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্যে আটকে থাকা এক পরিত্যক্ত নগরী।
ভাঙাচোরা সড়ক, হাঁটুপানি, বন্ধ ড্রেন, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ আর জলাবদ্ধতা যেন এখানকার স্থায়ী চিত্র। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়।
কোথাও কাদা, কোথাও বড় বড় গর্ত। ভারী যানবাহন চলাচলে ধুলার দুর্ভোগও কম নয়। শ্রমিকদের কর্মস্থলে পৌঁছানো থেকে শুরু করে রপ্তানি পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে শিল্পাঞ্চল থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়, সেই শিল্পাঞ্চলের মৌলিক অবকাঠামো কেন বছরের পর বছর এমন বেহাল ?
ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকায় প্রায় ৫৮ দশমিক ৫২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীতে ৭২৯টি প্লটের বিপরীতে রয়েছে ৪২৯টি শিল্প ইউনিট। বিসিক-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এখানে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ বিসিককে দেশের অন্যতম বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পনগরী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু শিল্পের আকার যত বড় হয়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেন ততটাই পিছিয়ে পড়েছে।
ঝুট ব্যবসা ঘিরে ‘অন্য এক বিসিক’
শুধু রাস্তা-ড্রেনের দুরবস্থাই নয়, বিসিকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসের অভিযোগও উঠছে।
২০২৬ সালেও বিসিকের ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের বিরোধ, সংঘর্ষ ও উত্তেজনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শিল্পমন্ত্রীর কাছে বিসিকের ঝুট সন্ত্রাস, ছিনতাই ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অর্থাৎ, একদিকে শিল্প উদ্যোক্তারা রপ্তানি বাড়াতে লড়ছেন, শ্রমিকরা কাদাপানি পেরিয়ে কারখানায় যাচ্ছেন; অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য বা ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে প্রভাবশালী চক্রের আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসছে।
ঝুট নিয়ে বিরোধ যে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, তার প্রমাণ মিলেছে ২০২৬ সালেও। মে মাসে বিসিকে একটি কারখানার ওয়েস্টেজ বা ঝুট নামানোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পুলিশ গিয়ে ঝুটবোঝাই ট্রাক আটক করে।
প্লট নিয়েও পুরোনো প্রশ্ন
বিসিকের জমি ও প্লট বরাদ্দ নিয়েও রয়েছে পুরোনো বিতর্ক।
২০১৮ সালে ফতুল্লার শাসনগাঁও বিসিক শিল্পনগরীতে ৩০টি প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ ছিল, প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের ওই প্লটগুলো মাত্র পৌনে দুই কোটি টাকায় বরাদ্দ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে।
অন্য এক প্রতিবেদনে ৩০টি প্লটের বিপরীতে ২৩ ব্যবসায়ীর অর্থ জমা দেওয়ার পরও প্লট না পাওয়ার অভিযোগ উঠে। অবশ্য তখন বিসিক কর্তৃপক্ষ অভিযোগের ব্যাখ্যায় বলেছিল, সংশ্লিষ্টরা বিসিকের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করেননি এবং টাকা বিসিকের হিসাবে জমা হয়নি।
অর্থাৎ, প্লট বরাদ্দের এই পুরোনো বিরোধই প্রশ্ন তোলে—বিসিকের জমি ব্যবস্থাপনায় কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে?
এলসি কাণ্ডে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন
বিসিকের অবকাঠামোগত দুরবস্থার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের পোশাক খাতকে ঘিরে ব্যাংকিং অনিয়মের সাম্প্রতিক ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখায় ভুয়া রপ্তানি আদেশ দেখিয়ে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। তদন্তে ২৯টি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রকৃত রপ্তানির তুলনায় অস্বাভাবিক মাত্রায় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার উদ্যোক্তারা ব্যাংকটির বিরুদ্ধে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি জালিয়াতি, অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও গ্রাহকদের নামে ভুয়া ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ তুলে তদন্ত দাবি করেন।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব অভিযোগের দায় পুরো গার্মেন্ট শিল্প বা সব শিল্প মালিকের ওপর চাপানো যায় না। বরং ব্যাংক কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পক্ষের ভূমিকা নিয়ে পৃথক ও নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত চিত্র বের করতে পারে।
এর আগেও নারায়ণগঞ্জে পোশাক খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং অনিয়মে দুদকের মামলা ও তদন্তের নজির রয়েছে। একটি মামলায় ২১ কোটি ও ৫ কোটি টাকার দুটি এলসি জালিয়াতির অভিযোগে ২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের কথা উঠে আসে। আরেক ঘটনায় একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির বিপরীতে নেওয়া অর্থের একটি অংশ পরিশোধ না করার অভিযোগে দুদক মামলা অনুমোদন করে।
২০২৫ সালে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার মাধ্যমে ভুয়া এলসি খোলার নামে ১০২ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে ওয়েস্ট অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্তও জানিয়েছিল দুদক।
অর্থনীতির ইঞ্জিনে উন্নয়নের বদলে দুর্ভোগ কেন ?
বিকেএমইএর সহ-সভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেলের অভিযোগ, বিসিকে দুটি প্রধান সড়ক ছাড়া অধিকাংশ সড়কই বেহাল। ড্রেনে স্ল্যাব নেই, ময়লা জমে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যায়। নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন জায়গায় ময়লা জমে থাকে।
বায়ারদের সামনে শিল্পাঞ্চলের এই চিত্র নিয়ে অস্বস্তির কথাও তিনি জানিয়েছেন।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের ভাষ্য, বিসিক থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হলেও শিল্পাঞ্চলটি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না।
শ্রমিকদের অভিযোগও একই।
একজন শ্রমিকের ভাষায়, সারাবছরই রাস্তায় কাদা থাকে। নারী শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন—বৃষ্টির সময় পানি-কাদা পেরিয়ে কর্মস্থলে যেতে হয়, আবার দেরি হলে মালিকপক্ষের চাপও থাকে।
এ যেন এক নির্মম বৈপরীত্য—যে শ্রমিকের ঘামে বৈদেশিক মুদ্রা আসে, সেই শ্রমিককেই কর্মস্থলে পৌঁছাতে হাঁটুপানি-কাদা পেরোতে হয়।
কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা: টাকার অভাব
অভিযোগের জবাবে ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বড় ধরনের সংস্কার করতে সরকারি বড় বরাদ্দ প্রয়োজন। তাঁর দাবি, দেশের ৮৩টি শিল্পনগরীর জন্য মিলিয়ে বছরে মাত্র ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার মতো বাজেট থাকে। ফলে ফতুল্লা বিসিকের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না।
তিনি জানান, শিল্পনগরীর প্রায় ৪১টি সড়কের মধ্যে ৭-৮টির কাজ হয়েছে। সমস্যা সমাধানে ৫০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পাঠানো হলেও মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই অর্থেও প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। পরে আরও বিস্তারিত প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে—
৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি করা একটি শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থ যদি বছরের পর বছর না থাকে, তাহলে এত বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে যে রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আসে, তার বিপরীতে শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব কার ?
দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত হবে কবে ?
ফতুল্লা বিসিকের সংকটকে শুধু ‘রাস্তা-ড্রেনের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্রের বড় অংশই আড়ালে থেকে যাবে।
ঝুট ব্যবসা ঘিরে আধিপত্যের অভিযোগ, প্লট বরাদ্দ নিয়ে পুরোনো অনিয়মের বিতর্ক, শিল্পাঞ্চল ঘিরে জমি ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগ এবং নারায়ণগঞ্জের পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং অনিয়ম—সবকিছু মিলিয়ে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও স্বাধীন অনুসন্ধান।
বিশেষ করে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—
- বিসিকের প্রতিটি প্লট কীভাবে বরাদ্দ হয়েছে;
- বরাদ্দের শর্ত বাস্তবে কতটা মানা হয়েছে;
- শিল্পকারখানার নামে বরাদ্দকৃত জমির ব্যবহার সঠিক আছে কি না;
- ঝুট ও ওয়েস্টেজ ব্যবস্থাপনায় কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় কি না;
- ঝুট বেচাকেনায় কারা নিয়ন্ত্রণ করে এবং কীভাবে লেনদেন হয়;
- শিল্পনগরীর ড্রেন, রাস্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে গত এক দশকে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে;
- সেই অর্থের কত টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে;
- কাজের মান যাচাই হয়েছে কি না;
- এবং কোনো কর্মকর্তা, ঠিকাদার বা প্রভাবশালী ব্যক্তি অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন কি না।
একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের ব্যাংকিং খাতে উঠে আসা হাজার কোটি টাকার এলসি ও ঋণ অনিয়মের ক্ষেত্রেও দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে যে বিপুল অঙ্কের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে, সেটিকে সাধারণ অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
শেষ কথা
ফতুল্লা বিসিক কোনো সাধারণ শিল্প এলাকা নয়। এটি নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকা, শত শত উদ্যোক্তার বিনিয়োগ এবং দেশের রপ্তানি আয়ের সঙ্গে এই শিল্পাঞ্চলের ভবিষ্যৎ জড়িত।
তাই প্রশ্ন শুধু—রাস্তা কবে হবে, ড্রেন কবে পরিষ্কার হবে ?
প্রশ্ন আরও গভীর—
৫ হাজার কোটি টাকার রপ্তানির শিল্পনগরী কেন মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত ?
ঝুটের কোটি টাকার বাণিজ্য কারা নিয়ন্ত্রণ করে ?
প্লট বরাদ্দের পুরোনো অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি কোথায় ?
ব্যাংকিং খাতে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের দায় কার ?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
শ্রমিক-উদ্যোক্তাদের ঘাম ও অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে যারা নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে ?
ফতুল্লা বিসিকের উন্নয়ন এখন আর কোনো ‘দাবি’ নয়; এটি শিল্প, শ্রমিক ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি।
একই সঙ্গে দুর্নীতি, অনিয়ম, দখল ও সন্ত্রাসের যেসব অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে এই শিল্পনগরীকে তার প্রাপ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ।









Discussion about this post