বন্দর প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ওয়াদুদ খন্দকারের মৃত্যুর ঘটনায় প্রায় দেড় বছর পর দায়ের হওয়া হত্যা মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি ও বন্দর প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি এবং দৈনিক মানবজমিনের বন্দর প্রতিনিধি নুরুজ্জামান মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে বন্দর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
নুরুজ্জামান মোল্লা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ওয়াদুদ খন্দকারের ভাই জাহিদ খন্দকারের দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
মামলাটিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি একজন সাংবাদিককেও আসামি করা হয়েছে।
তবে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ওয়াদুদ খন্দকারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ? তিনি কি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, নাকি এজাহারে বর্ণিত ব্যক্তিদের হামলার কারণেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরে মারা যান ? প্রায় দুই বছর পরও এ প্রশ্নের স্পষ্ট নিষ্পত্তি হয়নি।
২০২২ সালের সেই রাত
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১টার দিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন ওয়াদুদ খন্দকার। এ সময় জেলা পরিষদের সদস্য মাসুম আহমেদের নেতৃত্বে কয়েকজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি তার বাড়িতে প্রবেশ করে তার দুই ভাই জাহিদ খন্দকার ও মাসুদ রানাকে খুঁজতে থাকে।
এজাহারে দাবি করা হয়েছে, তাদের না পেয়ে ওয়াদুদকে ঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে চোখ বেঁধে টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডের বালুর মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার দুই ভাইয়ের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে শফিউদ্দিন ওরফে মুক্তার হোসেন তাকে ধরে রাখেন এবং নুরুজ্জামান চাপাতি দিয়ে তার বাম পায়ের গোড়ালির ওপর আঘাত করেন। আরেক আসামি হাতেম চাকু দিয়ে ওই স্থানের চামড়া ও মাংস কেটে দেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বাদী জাহিদ খন্দকার দাবি করেছেন, তিনি ও তার ভাই মাসুদ রানা দূর থেকে কথিত নির্যাতনের ঘটনা দেখেছিলেন।
এরপর কয়েক দিন ওয়াদুদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে পরিবার জানতে পারে, তাকে বন্দর থানার একটি মামলায় অজ্ঞাত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সমসাময়িক সংবাদে ভিন্ন চিত্র
তবে মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত মানবজমিনের প্রতিবেদনের বর্ণনায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
সমসাময়িক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে নিজ বাড়ি থেকে ওয়াদুদ খন্দকারকে তুলে নিয়ে যায় বন্দর থানা পুলিশ। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে অজ্ঞাত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছিল।
ওই প্রতিবেদনে ওয়াদুদের স্ত্রী তানজিলা বেগমের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়।
তার দাবি ছিল, রাত ২টার দিকে বন্দর থানার এসআই সাইফুল ইসলাম পাটোয়ারীসহ পুলিশের একটি দল ওয়াদুদকে ঘুম থেকে তুলে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তার স্বামীকে নির্যাতন করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে কারাগারে থাকা অবস্থায় ওয়াদুদের পায়ে পচনসহ শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। জামিনে মুক্তির পর প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়।
তবে সে সময়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাইফুল আলম পাটোয়ারী মানবজমিনকে বলেছিলেন, ওয়াদুদকে কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। তিনি ওই মামলায় জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্তের বিষয় বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
দেড় বছর পর পুলিশের বিরুদ্ধে নয়, আসামি হলেন রাজনৈতিক নেতারা
ওয়াদুদের মৃত্যুর পরপরই পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও দীর্ঘ সময় কোনো হত্যা মামলা হয়নি। পরে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াদুদের ভাই জাহিদ খন্দকার বাদী হয়ে বন্দর থানায় মামলা করেন।
একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে মামলাটির নম্বর ২৫ এবং দণ্ডবিধির ৩৮৫ ও ৩০৪ ধারার উল্লেখ পাওয়া যায়।
মামলায় জেলা পরিষদের সদস্য মাসুম আহমেদ, মানবজমিনের বন্দর প্রতিনিধি নুরুজ্জামান, ধামগড় ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শফিউদ্দিন মুক্তার হোসেন, রাসেল, হাতেম, আজিজ দেওয়ান ভেন্ডার, সোহেল, জাতীয় পার্টির নেতা সানাউল্লাহ সানু, মিজানুর রহমানসহ ১০-১২ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
অর্থাৎ, ২০২৩ সালের সমসাময়িক প্রতিবেদনে যেখানে ওয়াদুদকে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল, পরবর্তী হত্যা মামলায় সেই ঘটনার দায়ের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও অন্য ব্যক্তিদের নাম।
মামলায় সাংবাদিক কেন ?
মামলার অন্যতম আলোচিত আসামি নুরুজ্জামান মোল্লা। তিনি একই সঙ্গে সাংবাদিক এবং বন্দর প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি হিসেবে পরিচিত।
মামলার এজাহারে তার বিরুদ্ধে ওয়াদুদকে চাপাতি দিয়ে কোপানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে ওয়াদুদের মৃত্যুর বিষয়ে মানবজমিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ ও পরিবারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল।
এই কারণে মামলাটি দায়েরের পর থেকেই সাংবাদিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
মামলার বিষয়ে নুরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন ভাষায় কথা বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তার বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক সমীকরণও আলোচনায়
মামলার বাদী ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্যদিকে মামলায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নামও রয়েছে।
এ কারণে ওয়াদুদ খন্দকারের মৃত্যুর ঘটনাটি কেবল একটি ফৌজদারি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ ও দলীয় প্রভাবের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মামলাটি দায়েরের পেছনে স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব ছিল। তবে এটি সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ—স্বাধীনভাবে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
দুই বছরের মাথায় গ্রেপ্তার
মামলা দায়েরের প্রায় দুই বছর পর নুরুজ্জামান মোল্লার গ্রেপ্তার ঘটনাটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। পুলিশ তাকে ওয়াদুদ খন্দকার হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার পাশাপাশি মাদক ব্যবসাসহ একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি
ওয়াদুদ খন্দকারের মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—
তাকে আসলে কে বা কারা বাড়ি থেকে তুলে নিয়েছিল ?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, নাকি এজাহারে বর্ণিত ব্যক্তিরা তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছিলেন ?
তার পায়ের গুরুতর জখম কীভাবে হয়েছিল ?
কারাগারে থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি কেন হলো ?
২০২৩ সালের সমসাময়িক সংবাদ এবং ২০২৪ সালের হত্যা মামলার বর্ণনায় এত বড় পার্থক্য কেন ?
মামলার এজাহারে যাদের নাম এসেছে, তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে ?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে তদন্তের নথি, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তসংক্রান্ত তথ্য, কারাগারের মেডিকেল রেকর্ড, ২০২২ সালের সংশ্লিষ্ট মামলার কাগজপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দির ওপর।
এখন নুরুজ্জামান মোল্লার গ্রেপ্তারের পর মামলাটির তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে এগোয় এবং ওয়াদুদ খন্দকারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তে কতটা স্পষ্ট হয়—সেটিই দেখার বিষয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: প্রায় দুই বছর ধরে ঝুলে থাকা এই মৃত্যুর রহস্য এখন নতুন করে তদন্তের কেন্দ্রে এসেছে।









Discussion about this post