নির্ধারিত ঘাটের বাইরে সার ওঠানামা
নারায়ণগঞ্জে ভর্তুকির সার নিয়ে নতুন প্রশ্ন, প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
কৃষকের জন্য সরকারি ভর্তুকিতে বরাদ্দ দেওয়া সার নারায়ণগঞ্জের নদীপথে পরিবহন, খালাস ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ফতুল্লার আলীগঞ্জ মাদ্রাসা এলাকার মোকারম সরদারের ঘাটে সার ওঠানামা, সংরক্ষণ এবং এর গন্তব্য নিয়ে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন নারায়ণগঞ্জের নদীবন্দরগুলো দিয়ে পরিবহন করা সারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসন বিশেষভাবে নজরদারি জোরদারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নদীবন্দরসমূহে পরিবহনকৃত ও বিতরণকৃত সারের ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও সরবরাহ নিয়ে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কৃষি বিভাগ, বিএডিসি, নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ, সার পরিবহন ও বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। সভায় কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যাতে মজুত বা কালোবাজারে না যায়, তা কঠোরভাবে নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নদীবন্দর দিয়ে আসা সারের আগমন, মজুত ও বিতরণের তথ্য নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির সুযোগ না দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে আলীগঞ্জের একটি ঘাট
সম্প্রতি প্রকাশিত স্থানীয় একাধিক প্রতিবেদনে ফতুল্লার আলীগঞ্জ মাদ্রাসা এলাকার মোকারম সরদারের ঘাটকে ঘিরে সরকারি ভর্তুকির সার লোড-আনলোড ও সংরক্ষণের অভিযোগ তোলা হয়েছে। ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্ধারিত ঘাটের বাইরে সার ওঠানামা হলে সরকারি সারের প্রকৃত হিসাব ও গন্তব্য অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্ত প্রতিবেদনে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট ঘাটে ওঠানামা করা সার সরকারি ভর্তুকির সার নাকি বেসরকারি আমদানিকৃত সার, সেটিই এখন যাচাইয়ের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্যও এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফতুল্লা মাদ্রাসা ঘাট ও মুন্সীগঞ্জের কিছু ঘাটে সার লোড-আনলোড হলেও সেগুলো ব্যক্তিগত পণ্যের অনুমোদনের আওতায়; সরকারি সার নয়। অনিয়মের কারণে কিছু লাইসেন্স স্থগিত করার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
অর্থাৎ অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন তদন্তের বিষয়।
আসল প্রশ্ন সারের হিসাব নিয়ে
একটি জাহাজে কত টন সার উঠল, ঘাটে কত টন খালাস হলো, কোথায় গেল, কোন গুদামে ঢুকল এবং শেষ পর্যন্ত কোন ডিলারের মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছাল—এই ধারাবাহিক হিসাব মিলিয়ে দেখা হলে অনিয়মের চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদন্তে তাই অন্তত পাঁচটি তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন—
১. সংশ্লিষ্ট জাহাজে মোট কত টন সার ছিল?
২. কোন প্রতিষ্ঠানের নামে চালানটি আমদানি বা পরিবহন করা হয়েছে?
৩. কোন ঘাটে কত টন সার খালাসের অনুমতি ছিল?
৪. খালাসের পর সার কোন গুদামে গেছে?
৫. শেষ পর্যন্ত কোন ডিলার বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কত টন সার সরবরাহ করা হয়েছে?
এই হিসাবের সঙ্গে ঘাটের শ্রমিক, পরিবহনকারী, গুদাম ও ডিলারের তথ্য মিলিয়ে দেখা গেলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
অতীতের অভিযোগও সামনে
মোকারম সরদারের ঘাটকে ঘিরে অতীতেও সার-সংক্রান্ত অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের মাধ্যমে ওই ঘাট ব্যবহার করে সার বিদেশে পাচারের পুরোনো অভিযোগের প্রসঙ্গও এসেছে। তবে সেই পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান ঘাট পরিচালনা বা মোকারম সরদারের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি বর্তমান পর্যায়ে প্রমাণিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ফলে অতীতের অভিযোগ এবং বর্তমানের সার ওঠানামার অভিযোগ—দুটিকে আলাদা করে তদন্ত করাই হবে দায়িত্বশীল পদ্ধতি।
প্রশাসনের সামনে এখন বড় পরীক্ষা
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ৯ সেপ্টেম্বরের সভার সিদ্ধান্তের পর নির্ধারিত ঘাটের বাইরে সার ওঠানামা হচ্ছে কি না, হলে কী ধরনের সার এবং কার অনুমোদনে হচ্ছে—তা সরেজমিনে যাচাই করা জরুরি।
কারণ, নদীবন্দরভিত্তিক সার সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি ঘাট যদি সরকারি নজরদারির বাইরে চলে যায়, তাহলে শুধু মজুত বা কালোবাজারির ঝুঁকি নয়, সারের প্রকৃত গন্তব্য শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
নারায়ণগঞ্জে এর আগে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অবৈধভাবে মজুতের ঘটনাতেও প্রশাসনিক অভিযান হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে রূপগঞ্জে বিজিবি ও র্যাবের যৌথ অভিযানে প্রায় ২ হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুত সয়াবিন তেল উদ্ধার ও একটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছিল।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, নদীবন্দর ও গুদামকেন্দ্রিক পণ্য ব্যবস্থাপনায় গোয়েন্দা তথ্য ও সরেজমিন নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্ত হওয়া দরকার যেসব বিষয়ে
মোকারম সরদারের ঘাটসহ নারায়ণগঞ্জের সব অননুমোদিত বা সন্দেহভাজন ঘাটে গত কয়েক মাসে কী পরিমাণ সার ওঠানামা করেছে—এ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যাচাই করা দরকার—
– ঘাটটির বর্তমান ইজারা ও অনুমোদনের পরিধি;
– সেখানে সার লোড-আনলোডের বৈধ অনুমতি আছে কি না;
– সাম্প্রতিক সময়ে কোন কোন জাহাজ থেকে সার খালাস হয়েছে;
– প্রতিটি চালানের কাগজপত্র;
– সরকারি ও বেসরকারি সারের পৃথক হিসাব;
– সংশ্লিষ্ট গুদামের স্টক রেজিস্টার;
– পরিবহনকারী ট্রাক/কার্গোর চালান;
– সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও ডিলারের তথ্য;
– এবং খালাসকৃত সারের প্রকৃত গন্তব্য।
এসব নথি মিলিয়ে দেখা হলে অভিযোগটি কেবল গুজব, নাকি বাস্তব কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত—তা স্পষ্ট হবে।
কৃষকের ভর্তুকির সার কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়
সরকারি ভর্তুকির সার মূলত কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার অংশ। এই সার যদি অবৈধভাবে মজুত, কালোবাজারি কিংবা অনুমোদনহীন পথে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে এর সরাসরি চাপ পড়ে কৃষকের ওপর।
তাই নারায়ণগঞ্জের নদীবন্দরগুলোতে সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ এখন গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—জাহাজে যত টন সার এসেছিল, কৃষকের কাছে তার পুরোটা কি পৌঁছেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কোনো ব্যক্তি বা ঘাটকে আগেভাগে দায়ী না করে জাহাজের চালান থেকে কৃষকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনের হিসাব একসঙ্গে যাচাই করতে হবে। তাহলেই বেরিয়ে আসতে পারে নারায়ণগঞ্জের সার ব্যবস্থাপনায় কোনো সিন্ডিকেট বা অনিয়মের বাস্তব চিত্র।









Discussion about this post