৮০ টাকার শ্রমিক থেকে শতকোটি—মোকারমের ঘাটে এখনো কি চলছে প্রভাবের রামরাজত্ব ?
সরকারি ভর্তুকির সার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ, নির্ধারিত ঘাট এড়িয়ে আলীগঞ্জে লোড-আনলোডের প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
একসময় দৈনিক ৮০ টাকা মজুরিতে লোড-আনলোডের শ্রমিক। এরপর শ্রমিকদের সর্দার। তারপর ব্যবসা, রাজনৈতিক প্রভাব, উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ—আর এখন শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ। এই বিস্ময়কর উত্থানের কেন্দ্রে থাকা মোকারম সরদারকে ঘিরে পুরোনো প্রশ্নের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে নতুন প্রশ্ন—সরকারি ভর্তুকির কৃষি সার কি তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন ঘাটের আড়ালে লেনদেন হচ্ছে ?
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ মাদ্রাসা এলাকার মোকারম সরদারের ঘাটকে ঘিরে সরকারি ভর্তুকির সার লোড-আনলোড, অবৈধ মজুত, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং অতিমুনাফার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, নির্ধারিত ঘাটের বাইরে এই ঘাটসহ কিছু স্থানে সার ওঠানামা করায় সারের প্রকৃত হিসাব ও গন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো—এই ঘাট দিয়ে যে সার যাচ্ছে, তার সবটাই কি ব্যক্তিগত আমদানির সার, নাকি সরকারি ভর্তুকির সারও এর মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে ?
সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, চালান, গুদাম রেজিস্টার, আমদানিকারকের নথি ও নৌযান চলাচলের তথ্য যাচাই করলেই এর উত্তর বেরিয়ে আসতে পারে।
শ্রমিক থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী
প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মোকারম সরদার নব্বইয়ের দশকে কিশোরগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে আলীগঞ্জ এলাকায় লোড-আনলোড শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের সর্দার হন এবং জাহাজের পণ্য ওঠানামার ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার করেন। প্রথম আলোসহ অসংখ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রের বরাতে তাঁর সঙ্গে সাবেক ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের ঘনিষ্ঠতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যুগান্তর ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, মাত্র ৮০ টাকা মজুরির শ্রমিকের কাজ থেকে মোকারম পরবর্তীতে বিপুল সম্পদের মালিক হন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হলেও এই সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও বৈধ উৎস সরকারি নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
প্রশ্ন তাই একটাই—একজন সাধারণ লোড-আনলোড শ্রমিকের এত দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে কোন কোন ব্যবসা, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন কাজ করেছে?
হারুন-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, মামলায় নাম
মোকারম সরদারকে সাবেক ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে বলা হয়, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে করা একটি মামলায় হারুন অর রশীদ ও মোকারমসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছিল।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে হারুনের ‘ক্যাশিয়ার’ বা অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিচয় ও অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত নথির মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু মোকারমের অতীত নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—যে প্রভাববলয়ের সঙ্গে তাঁর নাম এতদিন ধরে ঘুরছে, সেই প্রভাববলয় কি এখনো তাঁর ব্যবসা ও ঘাট পরিচালনায় কোনো ভূমিকা রাখছে ?
পুরোনো সার-সংশ্লিষ্ট অভিযোগের পর নতুন করে আলোচনায় ঘাট
মোকারম সরদারের ঘাটকে ঘিরে সার বাণিজ্যের অভিযোগ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের মাধ্যমে এই ঘাট ব্যবহার করে সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগের কথাও এসেছে। তবে এ অভিযোগের সঙ্গে বর্তমানে মোকারম সরদার সরাসরি জড়িত—এমন প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি; বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে সরকারি ভর্তুকির সার নিয়ে।
কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দেওয়া সারের উদ্দেশ্য হলো কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো। সেই সার যদি নির্ধারিত সরবরাহব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে গিয়ে মজুত, কালোবাজারি কিংবা পাচারের পথে যায়, তাহলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘাড়েই পড়ে।
নির্ধারিত ঘাট বাদ দিয়ে কেন আলীগঞ্জ ?
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের ১৯ জেলার জন্য নারায়ণগঞ্জে নির্ধারিত কয়েকটি ঘাটে সার লোড-আনলোডের ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ আলীগঞ্জ মাদ্রাসা ঘাট ও মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরের কয়েকটি ঘাটকে ঘিরে সরকারি সার ওঠানামার অভিযোগ উঠেছে।
বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের পূর্বের বক্তব্য অনুযায়ী, ফতুল্লা মাদ্রাসা ঘাট ও মুন্সীগঞ্জে কিছু সার লোড-আনলোড হলেও তা ব্যক্তিগত মালের অনুমোদনের আওতায়, সরকারি সার নয়। অনিয়মের কারণে কিছু লাইসেন্স স্থগিত এবং প্রয়োজনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালানোর কথাও তিনি জানিয়েছিলেন।
তাহলে প্রশ্ন আরও সরাসরি—
যদি সরকারি সার না-ই হয়, তাহলে ঘাটে ওঠানামা করা প্রতিটি চালানের আমদানিকারক কে ?
কোন নথিতে সেই সার ব্যক্তিগত আমদানির হিসেবে রয়েছে ?
কত টন সার এসেছে, কত টন বের হয়েছে এবং কোন গুদামে গেছে ?
ঘাটের ইজারাদার বা ব্যবস্থাপকের কাছে এসবের পূর্ণ হিসাব আছে কি না ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করলেই অভিযোগের বড় অংশের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
‘ডিসি জানে’—দাবির সত্যতা কোথায়?
ঘাটের ইজারাদার হিসেবে মোকারম সরদারের বক্তব্যও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সার তাঁর ঘাটে কেন নামানো হচ্ছে সে বিষয়ে ‘ডিসি জানেন’ এবং তিনি নিজেকে শুধু শ্রমিক সরবরাহকারী হিসেবে দাবি করেছেন।
কিন্তু একই প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো—মোকারম যদি সত্যিই জেলা প্রশাসনের অনুমোদন বা জ্ঞাতসারে সরকারি সার ওঠানামার কথা বলে থাকেন, সেই অনুমোদনের লিখিত নথি কোথায়?
মৌখিক প্রভাবের রাজনীতি নয়—সরকারি নথিই এখানে সত্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত।
সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি
মোকারম সরদারের উত্থান নিয়ে অতীতে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর ব্যবসা, ঘাট, গুদাম, জমি, বাড়ি, যানবাহন, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানি ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা—সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্পদ যাচাই এখন সময়ের দাবি।
বিশেষ করে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—
- তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে কী কী স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে;
- কোন সময়ে এসব সম্পদ কেনা হয়েছে;
- সম্পদের ক্রয়মূল্য ও বর্তমান বাজারমূল্যের মধ্যে পার্থক্য কত;
- কোন কোন প্রতিষ্ঠানে তাঁর মালিকানা বা অংশীদারত্ব রয়েছে;
- আলীগঞ্জের ঘাটের ইজারা কীভাবে পেয়েছেন;
- ঘাট পরিচালনার বৈধ কাগজপত্র কী;
- গত কয়েক বছরে ঘাট দিয়ে কী পরিমাণ পণ্য ওঠানামা করেছে;
- সার আমদানিকারকদের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক সম্পর্ক কী;
- সরকারি সার ও ব্যক্তিগত আমদানির সার আলাদা রাখার কোনো কার্যকর হিসাবব্যবস্থা আছে কি না;
- তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলা ও অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা কী।
‘রামরাজত্ব’ বন্ধ হবে কবে ? নাকি ম্যানেজ সকল প্রশাসন ?
মোকারম সরদারের বিরুদ্ধে অতীতের বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলার বিষয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে। একই সঙ্গে বর্তমানেও তাঁর ঘাটকে ঘিরে সরকারি সার নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে বিষয়টি এখন আর কেবল একজন ঘাট ইজারাদারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটি কৃষকের ভর্তুকি, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন।
কোনো ব্যক্তি সাবেক কোনো ক্ষমতাবান পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা কিংবা বর্তমান ক্ষমতাকেন্দ্রের কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠ—এমন পরিচয় দিয়ে যদি সরকারি ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, সেটি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। তবে কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রমাণ প্রয়োজন।
সদ্য বিদায় ইউনুস ও বর্তমান সরকারের আমলে কোনো উপদেষ্টা বা মন্ত্রী অথবা তাঁর / তাদের পরিবারের কারও প্রভাব খাটিয়ে মোকারম সরদার আবারও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন—এমন অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য সূত্রে এই নির্দিষ্ট দাবির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত ‘সারের হিসাব’
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি অত্যন্ত সহজ একটি হিসাবের।
জাহাজে কত টন সার উঠল—ঘাটে কত টন নামল—গুদামে কত টন গেল—ডিলারের কাছে কত টন পৌঁছাল—কৃষক কত টন পেল ?
এই পাঁচটি সংখ্যার মধ্যে কোনো অমিল থাকলে সেখানেই লুকিয়ে থাকতে পারে সিন্ডিকেটের চিহ্ন।
তাই শুধু মোকারম সরদার নয়—সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক, সার ডিলার, ঘাটের ইজারাদার, গুদাম মালিক, পরিবহনকারী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা একসঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কৃষকের ভর্তুকির সার কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ব্যবসার পণ্য নয়। এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় কৃষি সহায়তা কর্মসূচির অংশ। সেই সার যদি কোনো প্রভাবশালী চক্রের হাতে আটকে গিয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি হয় বা দেশের বাইরে পাচারের পথে যায়, তাহলে সেটি শুধু বাণিজ্যিক অনিয়ম নয়—কৃষকের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর সরাসরি আঘাত।
সুতরাং মোকারম সরদারের আলীগঞ্জের ঘাটে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—
ঘাটে আসলে কী নামে, কার সার, কত টন সার এবং কার অনুমতিতে নামছে ?
এই চার প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ পেলেই বোঝা যাবে—এটি নিছক একটি ঘাট, নাকি দীর্ঘদিনের প্রভাব-নির্ভর কোনো অদৃশ্য বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের প্রবেশদ্বার।








Discussion about this post