‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ রেখে বিদায়? নতুন এসপির অভিযানে ৯১ গ্রেপ্তার
মহানগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। বিদায় নিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেলে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন নবাগত পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান। দায়িত্ব হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে মিজানুর রহমান মুন্সীর নারায়ণগঞ্জ অধ্যায়।
কিন্তু এসপি বদল হলেও নারায়ণগঞ্জ পুলিশের ভেতরে কথিত ‘কুমিল্লা সিন্ডিকেট’ বা ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ নিয়ে ওঠা প্রশ্ন কি শেষ হয়েছে—নাকি এর প্রভাব এখনো বহাল?
নতুন এসপির আমলে ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রেপ্তার হলেও অভিযানের ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
মিজানুর রহমান মুন্সীর দায়িত্বকালে পুলিশের একটি অংশকে ঘিরে ‘কুমিল্লা বলয়’ ও ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ থাকার অভিযোগ স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মিজানুর রহমান মুন্সীকে ১২ আগস্ট হাইওয়ে পুলিশে বদলির আদেশ দেওয়া হয় এবং ৩ সেপ্টেম্বর তিনি নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব ছাড়েন।
এসপি বদল, কিন্তু প্রশ্নের বদল নেই
নতুন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান জোরদার হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর দিনভর জেলার সাত থানা ও ডিবি পুলিশের অভিযানে মোট ৯১ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে জেলা পুলিশ। এর মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৪ সদস্য, ৭ মাদক কারবারি, ৬০ মাদকসেবী এবং অন্যান্য অপরাধে ২০ জন রয়েছেন।
অভিযানে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সদর, রূপগঞ্জ, বন্দর, সোনারগাঁ ও আড়াইহাজার থানার পাশাপাশি ডিবি পুলিশ অংশ নেয়। উদ্ধার করা হয়েছে মাদক, দেশীয় অস্ত্র এবং একজন ভিকটিমকে।
তবে এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন—অভিযানের সংখ্যাই কি অপরাধ দমনের সাফল্যের মাপকাঠি, নাকি অপরাধের মূল নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে কি না, সেটিই বড় বিষয় ?
কারণ মাঠপর্যায়ে ছিচকে অপরাধী, মাদকসেবী, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি কিংবা ছোটখাটো অপরাধে জড়িতদের ধরতে অভিযান দৃশ্যমান হলেও অপরাধের নেপথ্যের বড় চক্র, অর্থের প্রবাহ এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকলে প্রশ্ন থেকেই যায়।
‘রামরাজত্ব’ কার—জবাব চায় নারায়ণগঞ্জ
মিজানুর রহমান মুন্সীর সময়ে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ এবং কথিত ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, নতুন এসপির দায়িত্ব গ্রহণের পরও তা পুরোপুরি থামেনি।
বরং অভিযোগ রয়েছে, বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তা ফের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে পুরোনো নেটওয়ার্ক সচল রাখার চেষ্টা করছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই এখনো প্রয়োজন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এসপি বদলেছে, কিন্তু পুলিশের ভেতরের সেই কথিত অর্থনৈতিক বলয় কি বদলেছে ?
যদি কোনো কর্মকর্তা সত্যিই অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য বা অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, সম্পদের যাচাই এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একইভাবে অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমেই তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
৯১ গ্রেপ্তার—তারপর ?
নতুন এসপি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে জেলা পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানিয়েছেন, অপরাধ দমন এবং মাদক-সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো নয়। তারা দেখতে চান—মাদক কারবারের মূল হোতা কারা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির নেপথ্যে কারা, কোন প্রভাবশালী মহল তাদের আশ্রয় দেয় এবং পুলিশের ভেতরে কেউ যদি তাদের সহযোগিতা করে থাকে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের অভিযানকে দৃশ্যমান করেছে; এখন বড় পরীক্ষা হবে অপরাধের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানো।
আর সেই পরীক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—
মিজানুর রহমান মুন্সীর বিদায়ের সঙ্গে কি কথিত ‘কুমিল্লা ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’-এরও বিদায় হয়েছে, নাকি শুধু বদলেছে পুলিশের নেতৃত্বের চেয়ার?
এর উত্তর দিতে হলে প্রয়োজন দৃশ্যমান তদন্ত, কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই। নারায়ণগঞ্জবাসীর চোখ এখন নতুন পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।








Discussion about this post