সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদী খননের নামে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাট বিলীনের শঙ্কায় পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পাড় দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) মেঘনা নদী খননের কাজ দেয় মুন্সিগঞ্জের চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রা.) লিমিটেডকে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সোনারগাঁয়ের মোমেন সিকদারের নেতৃত্বে একটি চক্র স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ড্রেজিংয়ের আড়ালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রতিদিন রাতের আঁধারে ১০ থেকে ৩০টি ড্রেজার দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এতে আনন্দবাজার, ছনপাড়া, টেকপাড়া, খামারগাঁও ও পূর্ব দামোদরদীসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানান, আনন্দবাজার হাট শুধু একটি বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, এটি এলাকার ঐতিহ্য ও জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই হাটে কেনাবেচার জন্য আসেন। কিন্তু নদীর পাড় ঘেঁষে বালু উত্তোলনের কারণে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে, যা হাট, সড়ক ও আশপাশের বসতবাড়ির জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সোনারগাঁ উপজেলা যুবদল নেতা ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদ রানা এবং মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের বিএনপি নেতা আব্দুল বারেকসহ কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত।
যদিও মাসুদ রানা অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি সরাসরি জড়িত নন, কেবল তার ড্রেজার ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজার সংলগ্ন মেঘনা নদীর তীরে বালু দিয়ে অস্থায়ী বেড়িবাঁধ তৈরি করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই ড্রেজারের বিকট শব্দ শুরু হয় এবং গভীর রাত পর্যন্ত বালু উত্তোলন চলতে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাধা দিতে গেলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “রাতে ড্রেজারের শব্দে ঘুমাতে পারি না। প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। প্রশাসন সব জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না।”
অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে ইতোমধ্যে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত বর্ষায় পিরোজপুর ইউনিয়নের নুনেরটেক গ্রামে প্রায় ৩০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি শাহেদ কায়েস বলেন, “আগে আন্দোলনের মাধ্যমে এ এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু আবারও প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে তা শুরু হয়েছে, যা পরিবেশ, জনবসতি ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য মারাত্মক হুমকি।”
অভিযোগের বিষয়ে মোমেন সিকদারের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী নদী খননের কাজ চলছে এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের দায় তারা নেবেন না।
এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত বলেন, অনুমতি সাপেক্ষে নদী খননের কাজ চলছে। তবে রাতের আঁধারে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনবল সংকট ও ঝুঁকির কারণে রাতে অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারোয়ার জানান, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং পুলিশ সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, “রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আনন্দবাজার হাটসহ আশপাশের জনপদ অচিরেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।









Discussion about this post