নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের অভিযোগ উঠেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে। ব্যাংকটির নারায়ণগঞ্জ শাখার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম, জালিয়াতি ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ এনে ২৬টি পোশাক কারখানার মালিকরা বলেছেন—“এভাবে চলতে থাকলে শিল্পটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।”
শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা। তবে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ—দেশের অন্যতম প্রধান গার্মেন্টস হাব।
জাল এলসি, ভুয়া ঋণ আর ডলার কারসাজি: অভিযোগের পাহাড়
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০১৭ সাল থেকেই ব্যাংকের একটি অসাধু চক্র ভুয়া আইডি ব্যবহার করে জাল সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করে। সেই ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়, যদিও বাস্তবে কোনো কাঁচামাল আমদানি হয়নি।
এরপর শুরু হয় ভয়ঙ্কর আর্থিক কারসাজি—
# গ্রাহকের অজান্তে ফোর্সড লোন ও ডিমান্ড লোন সৃষ্টি
# চলতি হিসাব ব্যবহার করে এলসির দায় সমন্বয়ের নামে টাকা ঘোরানো
# বৈদেশিক মুদ্রা বাজার থেকে অস্বাভাবিক উচ্চ দামে ডলার কিনতে বাধ্য করা
ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, প্রতি ডলারে ১২-১৫ টাকা বেশি দামে ডলার কিনতে বাধ্য করায় প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত গাইডলাইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলতি হিসাব, নগদ জমা ও ঋণের মাধ্যমে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলেও তা না দিয়ে উল্টো ফাঁকা চেক ব্যবহার করে ঋণ আদায়ের মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন ভুক্তভোগীরা।
চাপ, হুমকি আর মৃত্যু: মানবিক বিপর্যয়
অভিযোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এই আর্থিক চাপে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী:
# ঋণের কাগজে স্বাক্ষরের জন্য একদিনে ৩৭ বার ফোন দিয়ে চাপ
# মানসিক চাপে একাধিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মৃত্যু
# একজন এমডি স্ট্রোক করে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত
এ ঘটনাগুলোকে তারা “প্রতিষ্ঠানিক নির্যাতনের চূড়ান্ত রূপ” বলে উল্লেখ করেন।
২৩ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ, ঝুঁকিতে ২৫ হাজার শ্রমিক
ব্যাংকের চাপ ও বিতর্কিত পুনঃতফসিল প্রক্রিয়ার কারণে ইতোমধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানানো হয়।
এর ফলে:
৳ প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর চাকরি ঝুঁকিতে
# নারায়ণগঞ্জের শিল্প অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির মুখে
# দেশের রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
“ব্যবসা চালু রাখার সুযোগ দিন, নইলে সব শেষ”
ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা বলেন,
“কারখানা বন্ধ করে দিলে ঋণ পরিশোধের কোনো সুযোগ থাকবে না। আমাদের ব্যবসা সচল রেখে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে।”
উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন—
# নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন
# স্বনামধন্য অডিট ফার্ম দিয়ে পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষা
# দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা
জানা গেছে, এ বিষয়ে গত ৬ এপ্রিল গভর্নরের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের শিল্প খাত কি বড় ধ্বংসের মুখে ?
দেশের অন্যতম শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে যদি এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে শুধু ২৬টি কারখানাই নয়—পুরো গার্মেন্টস খাত ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন প্রশ্ন একটাই—ব্যাংকিং খাতের এই ভয়াবহ অভিযোগের বিচার কি হবে, নাকি চাপা পড়বে সবকিছু ?









Discussion about this post