নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক তিনবারের নির্বাচিত মেয়র ও আলোচিত রাজনীতিক ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী আজ ৬০ বছরে পা রাখলেন।
১৯৬৬ সালের ৫ জুন নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে জন্ম নেওয়া এই জনপ্রতিনিধির এবারের জন্মদিন এসেছে এক ভিন্ন আবহে—দীর্ঘ কারাবাসের অধ্যায় পেরিয়ে পরিবারের সান্নিধ্যে।
গত বছরের এই দিনটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রের।
২০২৫ সালের ৫ জুন নিজের জন্মদিন এবং পরবর্তী ঈদুল আজহা—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ই তাকে কাটাতে হয়েছিল কারাগারের ভেতরে।
এরও আগে, ৯ মে সকালে নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটির’ থেকে তাকে আটক করে পুলিশ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর ধারাবাহিকভাবে মোট ১২টি মামলায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে টানা প্রায় ১৩ মাস বন্দিজীবন কাটাতে হয় এই জনপ্রতিনিধিকে।
তবে সময়ের চাকা ঘুরেছে।
গত বৃহস্পতিবার জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন নিজ বাসভবনে অবস্থান করছেন তিনি।
বন্দিদশার স্মৃতি পেছনে ফেলে এবারের জন্মদিনটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাটিয়েছেন আইভী—যা তার ব্যক্তিগত জীবনে এক আবেগঘন প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা ছিলেন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা। মা মমতাজ বেগমের স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠা আইভীর শৈশব থেকেই রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে।
শিক্ষাজীবনে তিনি দেওভোগ আখড়া বিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জ প্রিপারেটরি স্কুল ও মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
পরে রাশিয়ার ওডেসা পিরাগোভ মেডিকেল ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৯২ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৯৫ সালে কম্পিউটার প্রকৌশলী কাজী আহসান হায়াৎকে বিয়ে করে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি।
সেখানে মেডিকেল ল্যাব সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা নেন। তাদের সংসারে দুই ছেলে—সাদমান হায়াৎ সীমান্ত ও সাদরিল হায়াৎ অনন্ত।
রাজনীতিতে আইভীর উত্থান শুরু হয় নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক হিসেবে।
২০০৩ সালে দেশে ফিরে মাত্র ১৭ দিনের প্রস্তুতিতে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন এবং প্রথম নারী চেয়ারম্যান হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
এরপর ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়ে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
২০১৬ ও ২০২২ সালেও পুনর্নির্বাচিত হয়ে টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ২২ বছরের দীর্ঘ জনপ্রতিনিধিত্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার ঝুলিতে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠা, দখলদার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে আইভী “পরিচ্ছন্ন ইমেজের” রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার স্বীকৃতি রয়েছে।
২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দি এশিয়ান’ তাকে এশিয়ার প্রভাবশালী নারী মেয়রদের তালিকায় সপ্তম স্থানে স্থান দেয়। এছাড়া সমাজসেবায় অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি থেকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ লাভ করেন তিনি।
জীবনের উত্থান-পতনের বহু অধ্যায় পেরিয়ে ৬০ বছরে পা রাখা আইভীর এবারের জন্মদিন তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং এক প্রতীকী সময়েরও সাক্ষ্য বহন করছে—কারাবন্দি অন্ধকার থেকে ফিরে নতুন আলোয় দাঁড়ানোর গল্প।









Discussion about this post