নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা চুনা ও ঢালাই কারখানাগুলোকে ঘিরে যেন এক প্রহসনের চক্র চলছে। একদিকে প্রশাসনের অভিযান, অন্যদিকে সেই অভিযানের পরপরই পুনরায় কারখানা চালু—এই ‘ভাঙা-গড়ার খেলায়’ কার্যত ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চোরাই গ্যাস ব্যবহার করে পরিচালিত এসব কারখানা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ালেও তা বন্ধে দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেই। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কারখানার চুলা ভেঙে দিলেও কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো আবার চালু হয়ে যাচ্ছে। এতে স্পষ্টতই প্রশ্ন উঠেছে—অভিযান কি শুধুই দায়সারা ?
অল্প পুঁজিতে কোটি টাকার গ্যাস চুরি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি চুনা কারখানার চুলা পুনর্নির্মাণে খরচ হয় সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অথচ একই কারখানা থেকে প্রতি সপ্তাহে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হচ্ছে। ফলে ঝুঁকি থাকলেও ব্যবসাটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অর্ধশতাধিক কারখানায় অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে মাসে প্রায় তিন লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় এক কোটি টাকার বেশি। এই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিস্তার
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সোনারগাঁয়ে অবৈধ কারখানা স্থাপনের হিড়িক পড়ে। বিশেষ করে পিরোজপুর, মোগরাপাড়া ও পৌর এলাকায় দ্রুত বিস্তার লাভ করে এসব কারখানা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিকরা জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এ ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চালানো হচ্ছে এসব কার্যক্রম।
‘অভিযানের আগেই খবর’—যোগসাজশের অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের আগেই কারখানা মালিকরা তথ্য পেয়ে যান। ফলে তারা আগাম প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষতি কমিয়ে আনেন।
এমনকি ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তিতাস গ্যাসের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বারবার ভাঙা, তবু থামে না কারখানা
একই কারখানায় একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান আসছে না। কোনো কোনো কারখানা ৭-৮ বার পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তবুও তা পুনরায় চালু হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কেবল চুলা ভাঙা দিয়ে এ সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী নেতার কারখানায় তুলনামূলক কম অভিযান চালানো হয়, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব চুনা কারখানায় পাথর পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন ধোঁয়ায় নাইট্রোজেন অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায়। পাশাপাশি চুলার ছাই ও চুনের ধুলা বাতাসে মিশে আশপাশের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, চর্মরোগসহ নানা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। আবাসিক এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার অস্তিত্ব জননিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা না ব্যর্থতা ?
তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং এখন জমির মালিকদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা বলছে, এসব পদক্ষেপ এখনও কার্যকর ফল দিচ্ছে না।
প্রশ্ন উঠেছে—অল্প খরচে পুনর্গঠনযোগ্য অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিয়ে কতটা সমাধান সম্ভব? বরং প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।
এখনই কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন
সোনারগাঁয়ের এই পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সম্পদ লুট এবং পরিবেশ ধ্বংসের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। অবিলম্বে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
নচেৎ ‘অভিযান’ শব্দটি কেবলই একটি প্রহসনে পরিণত হবে—আর চলতেই থাকবে সোনারগাঁয়ের অবৈধ চুনা কারখানার এই অবাধ দৌরাত্ম্য।









Discussion about this post