নাসিকের ইজারা বাণিজ্যে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ: স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) অধীনস্থ হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ড, ঘাট, গণশৌচাগার এবং অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা কার্যক্রমকে ঘিরে নগরজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সদ্যসমাপ্ত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের ইজারা প্রক্রিয়া পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, অধিকাংশ ইজারাই গেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠদের হাতে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং সরকারি কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারা কার্যক্রমটি কার্যত একটি ‘ভাগবাটোয়ারার মহোৎসবে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রকৃত প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত ছিল।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে নিরুৎসাহিত হয়েছেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।
এরই মধ্যে শতকোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের একটি কথোপকথনের অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র দুই মিনিটের ওই রেকর্ডে তাকে ঠিকাদারদের প্রতি কঠোর বার্তা দিতে এবং সবাইকে সিডিউল ক্রয়ের নির্দেশনা দিতে শোনা যায়, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে।
এ ছাড়াও গত ১৪ জুন নগর ভবনে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত দরপত্রে বিভিন্ন সায়রাত মহালের ইজারা চূড়ান্ত করা হয়। এতে দেখা যায়, ইনস্টিটিউট রোড পার্শ্বস্থ অস্থায়ী কাঁচাবাজার এক কোটি ২২ লাখ টাকায় ইজারা পান আবু সালেহ আহম্মেদ সনেট, যিনি স্থানীয় বিএনপি ঘরানার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকায় ইজারা পান মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন।
এছাড়া বিভিন্ন গণশৌচাগার, বাসস্ট্যান্ড ও ক্ষতিপূরণ ফি আদায়ের ইজারাতেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইজারাদাররা বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১৩ মে নির্ধারিত ২২টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারাতেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। সর্বোচ্চ ৪৬ লাখ টাকায় গোদনাইলের একটি মাঠ ইজারা নেন যুবদল নেতা মো. মমতাজ উদ্দিন। অন্যদিকে সর্বনিম্ন তিন লাখ ৩০ হাজার টাকায় একটি হাট ইজারা দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের দলীয় প্রভাব শুধু প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং এতে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে। কারণ প্রকৃত প্রতিযোগিতা না থাকলে সর্বোচ্চ দর নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল জব্বার বলেন, “ইজারা জনগণের সম্পদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়া হলে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়।”
একই সুরে জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক জুবায়ের শিকদার বলেন, “প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অবশ্যম্ভাবী।”
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে নাসিক প্রশাসন।
প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান দাবি করেন, “সব ইজারা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো ভূমিকা নেই। সর্বোচ্চ দরদাতাই ইজারা পেয়েছেন।”
তার মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমেই সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। কারও কাছে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ দর দিয়ে কেউ ইজারা পেলে আপত্তি নেই। তবে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।”
সব মিলিয়ে, নাসিকের ইজারা কার্যক্রম ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে—তা শুধু রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এখন সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থের একটি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, এই ইজারাগুলো থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় এবং নাগরিক সেবা কতটা নিশ্চিত করতে পারে সিটি করপোরেশন।









Discussion about this post