১৭ বছরেও শেষ হয়নি নদীর সীমানা: উন্নয়ন অগ্রগতির আড়ালে ঝুঁকিতে ঢাকার চার নদী
স্টাফ রিপোর্টার :
ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু—এই চার নদী শুধু জলপথ নয়, রাজধানীর পরিবেশ, অর্থনীতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক নির্দেশনার ১৭ বছর পরও এই নদীগুলোর সীমানা চিহ্নিত করার কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে নতুন করে দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার ঝুঁকি বাড়ছে—যা নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ রক্ষায় বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
২০০৯ সালের জুনে হাইকোর্ট ঢাকার চার নদীর সীমানা নির্ধারণ করে প্রায় ১০ হাজার পিলার স্থাপনের নির্দেশ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে দখলমুক্ত রাখা। শুরুতে গণপূর্ত অধিদপ্তর কিছু পিলার স্থাপন করলেও আইনি জটিলতা ও সমালোচনার মুখে তা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
বিআইডব্লিউটিএ গত এক দশকে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা সরিয়েছে এবং শত শত একর নদীতীর উদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে নদীতীর রক্ষায় ওয়াকওয়ে, সুরক্ষা দেয়াল ও জেটি নির্মাণের মতো অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমও হাতে নেয় সংস্থাটি। ২০১৮ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়।
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও তৃতীয় ধাপেই এসে থমকে গেছে পুরো উদ্যোগ। ৫২ কিলোমিটার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ শেষ হয়েছে, সাত হাজারের বেশি পিলারের মধ্যে ছয় হাজারের কিছু বেশি বসানো হয়েছে। প্রকল্পের প্রায় ৯২ শতাংশ কাজ শেষ হলেও বাকি অংশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যেখানে রয়েছে বিস্তৃত ও ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর এলাকা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এখনও প্রায় এক হাজার পিলার স্থাপন বাকি এবং ৩২ কিলোমিটারের বেশি নদীতীরে কোনো সীমানা চিহ্নই নেই। আরও বড় বিষয়, তৃতীয় ধাপে নির্ধারিত ১৪৮ কিলোমিটার এলাকায় এখনও কোনো সুরক্ষা দেয়াল নির্মিত হয়নি। ফলে এসব এলাকা আবারও দখলের ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ বাস্তবায়নে অর্থায়ন জটিলতাই মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হলেও তা অনুমোদন পায়নি। পরে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে নতুন করে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, তবে বাস্তবায়ন কবে শুরু হবে তা এখনও অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়—স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ ও সুরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা না গেলে নদী রক্ষা সম্ভব নয়। নদীর তীর চিহ্নিত না থাকলে দখলদাররা সুযোগ নেয়, আর প্রশাসনের অভিযানও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবশিষ্ট এলাকাগুলোতে পিলার স্থাপন, ওয়াকওয়ে, সুরক্ষা দেয়াল, জেটি ও ইকোপার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তবতা বলছে—পরিকল্পনা যত বড়ই হোক, বাস্তবায়নের গতি না বাড়লে নদী রক্ষার লড়াইয়ে সময়ই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।
রাজধানীর চার নদীকে ঘিরে এই দীর্ঘসূত্রতা এখন কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; এটি পরিবেশগত নিরাপত্তা, নগর ভবিষ্যৎ এবং জনস্বার্থের একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়নই পারে এই নদীগুলোকে পুনরায় দখল ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে।









Discussion about this post