থানার টয়লেটে ‘দর-কষাকষি’: আড়াই লাখে মুক্তি—ফতুল্লায় পুলিশের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতেই যদি আইন ভেঙে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায় ?
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘৃণ্য চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
অভিযোগ উঠেছে—একজন ব্যক্তিকে ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ আখ্যা দিয়ে আটক করে পরে গভীর রাতে থানার টয়লেটের ভেতরে পরিবারের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
রোববার (২ আগস্ট) রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি শুধু অনিয়ম নয়, বরং পুরো পুলিশ ব্যবস্থার ওপর এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কাশিপুর এলাকার সোনা মিয়ার ছেলে নাজমুল হক ডালিম চৌধুরীকে তার নিজ বাড়ি থেকে আটক করেন ফতুল্লা মডেল থানার এএসআই আব্দুল হামিদ খান।
আটকের পরপরই তার পরিবারের সদস্যরা থানায় ছুটে গেলে শুরু হয় ‘দেন-দরবার’। প্রথমে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দীর্ঘ দর-কষাকষির পর তা নেমে আসে আড়াই লাখ টাকায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক তথ্য হলো—এই লেনদেন কোনো গোপন স্থানে নয়, বরং থানার ভেতরেই, একটি টয়লেটের মধ্যে সম্পন্ন হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, পরিবারের সদস্যদের টয়লেটে নিয়ে গিয়ে সেখানে টাকা গুনে নেন এএসআই আব্দুল হামিদ খান।
এরপরই হাজতখানা থেকে ডালিমকে মুক্তি দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, মুক্তির শর্ত হিসেবে ডালিমকে এক মাস বাড়িতে না থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়—যা আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তার এখতিয়ারের বাইরে।
ঘটনার আরও নাটকীয় মোড় আসে পরদিন।
সোমবার সকালে বিষয়টি জানতে পারেন এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম।
তিনি সরাসরি পুলিশকে প্রশ্ন করেন—কেন আটক করা হলো, আবার কেন ছেড়ে দেওয়া হলো ? এবং ছেড়েই যখন দেওয়া হয়েছে, তাহলে নেওয়া টাকা ফেরত দিতে হবে।
চাপের মুখে পড়ে অবশেষে এএসআই আব্দুল হামিদ খান ডালিমের পরিবারের কাছে আড়াই লাখ টাকা ফেরত দেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছাত্রশক্তির ওই নেতা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
ডালিমের পরিবারের সদস্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই। তবুও তাকে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে অভিযুক্ত এএসআই আব্দুল হামিদ খান এ বিষয়ে কথা বলতে গড়িমসি করে বলেন, “পরে বলব।” অন্যদিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলমের বক্তব্য—“এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।”
প্রশ্ন উঠছে—একটি থানার ভেতরে, একটি টয়লেটে বসে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়, একজন আটক ব্যক্তিকে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেওয়া হয়—আর থানার ওসি কিছুই জানেন না! এটি কি বিশ্বাসযোগ্য, নাকি দায় এড়ানোর কৌশল?
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, থানাকে কেন্দ্র করে একটি ভয়ংকর অনিয়ম ও দুর্নীতির চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। যেখানে আইনের শাসন নয়, বরং টাকার বিনিময়ে বিচার-বাণিজ্য চলছে।
এখন সময় এসেছে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার। অন্যথায় এমন ঘটনা শুধু ফতুল্লা নয়, সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা আরও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।









Discussion about this post