সোনারগাঁয়ে স্কুলছাত্রীকে লাথি: ভিডিও ভাইরাল, অভিযুক্ত আটক—শিক্ষা-নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে কিশোর অপরাধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা—এই তিনটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পুলিশ জানায়, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত কিশোর দিলশাদ হোসেনকে শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রংপুর থেকে আটক করা হয়। এ অভিযানে তার পরিবার সহযোগিতা করেছে। আটক দিলশাদ সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর রায়েরটেক এলাকার এক ভাড়াটিয়া পরিবারের সদস্য। তার বাবা রিকশাচালক এবং মা গার্মেন্টসকর্মী।
ঘটনার বিবরণ জানা গেছে, প্রায় এক মাস আগে কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী—তানিসা আক্তার ও মিম আক্তার—শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়সংলগ্ন একটি ওয়াকওয়ে এলাকায় গেলে তাদের পিছু নেয় অভিযুক্ত কিশোর। একপর্যায়ে সে পেছন থেকে তানিসাকে লাথি মারে। প্রতিবাদ করলে আবারও লাথি দেওয়া হয়। এ সময় তার এক সহযোগী মোবাইল ফোনে ঘটনাটি ধারণ করে।
ভিডিওটি গত বৃহস্পতিবার ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায়, ভুক্তভোগী ছাত্রীটি স্কুল ড্রেস পরা অবস্থায় ছিল, যা স্কুল চলাকালীন সময়ের নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ ভুক্তভোগী তানিসার বাবা শাহীন মিয়া অভিযোগ করেন, ঘটনার পর উল্টো তার মেয়েকেই স্কুল থেকে টিসি দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা নিম্নআয়ের মানুষ। এখন মেয়েকে অন্য স্কুলে ভর্তি করানো আমাদের জন্য বড় কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তবে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন সরকার টিসি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই নিয়মিত স্কুল ফাঁকি দিত। একাধিকবার মৌখিক সতর্কতার পর অভিভাবকদের লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে, তবে কাউকে বহিষ্কার করা হয়নি।
বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি মো. মহিউদ্দিন মিয়াও একই বক্তব্য দিয়ে বলেন, “শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে অভিভাবকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়নি।”
প্রশাসনের পদক্ষেপ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সির নির্দেশে সোনারগাঁ থানা পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। অভিযুক্ত কিশোরকে আটকের পর তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার আওতায় এনে সমাজসেবা বিভাগের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয়েছে।
জেলা সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন অফিসার নূর ফারজানা জানান, কিশোরটিকে ছয় মাস কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময় তার অভিভাবকদের নিয়মিত উপস্থিত থাকতে হবে। তিনি বলেন, “ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকায় পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
সমাজে প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই কিশোরদের সহিংস আচরণ, সহপাঠীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং ভিডিও ধারণ ও প্রচারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষাবিদ ও সমাজবিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় শুধু শাস্তিমূলক নয়, প্রতিরোধমূলক ও সচেতনতামূলক উদ্যোগও জরুরি। স্কুল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, আচরণগত প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
উপসংহার সোনারগাঁয়ের এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং এটি কিশোর আচরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং সামাজিক মূল্যবোধের একটি প্রতিচ্ছবি। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই কেবল এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।









Discussion about this post