নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট নিরসনে আবারও নেওয়া হয়েছে নানা সিদ্ধান্ত—অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ব্যস্ত সময়ে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ এবং রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত পণ্যবাহী যান চলাচলের অনুমতি।
আজ বুধবার (১২ আগষ্ট) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সেমিনারে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সভা শেষে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু সিদ্ধান্ত আর অভিযান দিয়ে কি নগরীর দীর্ঘদিনের যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব ?
সভায় জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, চাষাড়া এলাকায় অবৈধভাবে বাস, সিএনজি ও অটোরিকশা পার্কিং বন্ধ করতে হবে। সড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিং, ভ্যান-রিকশার স্ট্যান্ড ও ফুটপাতের দোকানের বিরুদ্ধে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তও জানানো হয়।
একই সঙ্গে দিনের ব্যস্ত সময়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ রেখে রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এসব যান চলাচলের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সভা শেষে উপস্থিত এক প্রবীণ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর সভা-সেমিনার হলেও যানজটের মূল সমস্যাগুলো থেকে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগের তীর যায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকার দিকে।
অভিযোগের কেন্দ্রে ট্রাফিক কর্মকর্তা আব্দুল করিম
সভা-সংশ্লিষ্ট ওই প্রবীণ নেতার অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের যানজট শুধু রাস্তার সংকীর্ণতা, অবৈধ পার্কিং কিংবা অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে তৈরি হচ্ছে না; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও কথিত চাঁদাবাজির একটি চক্র।
তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) আব্দুল করিম শেখের প্রভাবাধীন একটি সিন্ডিকেট বিভিন্ন সিএনজি স্ট্যান্ড, ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জের সিএনজি, বন্ধন, উৎসব, বন্ধু, আনন্দ পরিবহন, দূরপাল্লার বাস কাউন্টার এবং ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার, ছাড়াও ইট-বালুবাহী ট্রাকসহ সকল ট্রাক থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করে থাকে।
তাঁর দাবি, এর ফলে অবৈধ স্ট্যান্ড ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের আপস তৈরি হয়েছে।
প্রকাশ্য সংবাদ প্রতিবেদনে আব্দুল করিম শেখকে নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের টিআই (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন সময়ে তিনি নগরের যানজট, অটোরিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্যও দিয়েছেন।
যানজটের কারণ কি শুধু অবৈধ পার্কিং ?
নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে চাষাড়া গোলচত্বর এলাকায় সিএনজি ও নিষিদ্ধ যানবাহনের স্ট্যান্ড, অবৈধ বাস কাউন্টার, সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এবং রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ একটি স্ট্যান্ড উচ্ছেদের পর কয়েকদিনের মধ্যেই যদি আবার সেখানে যানবাহন দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি শুধু চালক বা মালিকের নয়; এর পেছনে তদারকি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও রয়েছে।
২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে নগরকে যানজটমুক্ত রাখতে অবৈধ অটোরিকশা ও ইজিবাইকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়েও নগরের যানজট ও অবৈধ যানবাহন নিয়ে অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
‘মাসোহারা’র অভিযোগ—জোড়ালো তদন্ত হবে কি ? আর তদন্ত করবেই বা কে ?
প্রবীণ ওই নেতার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, পরিবহন খাত থেকে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয় এবং তার একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কথাও তিনি দাবি করেন। যার ফলে এমন অপরাধ কর্মকান্ড অবিরাম পন্থায় চালিয়ে যাচ্ছে আব্দুল করিম চক্র।
তবে অভিযোগটি গুরুতর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে পরিবহন খাতের স্ট্যান্ড, রুট, পার্কিং, চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের গত কয়েক বছরের পোস্টিং ও দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক লেনদেন তদন্ত করে দেখতে পারে।
প্রশ্ন নগরবাসীর
যানজট নিরসনের জন্য সভা হয়েছে, সিদ্ধান্ত হয়েছে, অভিযানও হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো কার ছত্রছায়ায় টিকে থাকে ? দিনের ব্যস্ত সময়ে নিষিদ্ধ যান কীভাবে সড়কে ঢোকে ? ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর আবার কীভাবে দখল হয়ে যায় ? আর ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাবশালী মহল বাধা সৃষ্টি করে কি না ?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের না হলে একের পর এক সভা, উচ্ছেদ অভিযান কিংবা নতুন সিদ্ধান্তেও নারায়ণগঞ্জবাসীর দুর্ভোগ কমবে না বলে মনে করছেন নগরবাসী।









Discussion about this post