নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ নগরীর ব্যস্ততম এলাকা দুই নম্বর রেলগেট। প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও অসংখ্য যানবাহনের চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়টি দীর্ঘদিন ধরেই যানজট, অবৈধভাবে বাস দাঁড় করানো, ফুটপাত দখল ও সড়কের জায়গা ব্যবহারের কারণে নাগরিক দুর্ভোগের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
অথচ এসব সমস্যা সমাধানের বদলে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘ফিরে দেখা ৭১’।
বুধবার (১২ আগষ্ট) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘জেলায় সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও যানজট নিরসন’ শীর্ষক সেমিনারে ভাস্কর্যটি অপসারণ নিয়ে বক্তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়।
কেউ বলছেন, যানজট নিরসনে ভাস্কর্যটি সরানো প্রয়োজন; অন্যদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কেউ কেউ বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকটি দুই নম্বর রেলগেটেই রাখা যেতে পারে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—দুই নম্বর রেলগেটের যানজটের মূল কারণ কি সত্যিই ভাস্কর্য ?
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পুরো সড়কের জায়গা ব্যবহার করে বাস দাঁড় করানো, যাত্রী ওঠানামা এবং ফুটপাত ও আশপাশের জায়গা দখলের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
দিনের ব্যস্ত সময়ে বাস ও অন্যান্য যানবাহনের এলোমেলো অবস্থান তৈরি করছে দীর্ঘ যানজট। ফলে পথচারীদেরও সড়কের ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
যানজট নিরসনের নামে ভাস্কর্য সরানোর আলোচনা হলেও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাসস্ট্যান্ড ও সড়ক দখলের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
বুধবারের সেমিনারে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, চাষাঢ়ার পর দুই নম্বর রেলগেট নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধের একটি ভাস্কর্য থাকা উচিত।
এর বিপরীতে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, ভাস্কর্যটি রাস্তার জন্য অসুবিধা তৈরি করছে এবং অনেক দোকানদার জায়গাটি দখল করে রাখছেন।
তবে আলোচনায় উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—যদি দখলই সমস্যা হয়, তাহলে দখলদারদের উচ্ছেদ না করে কেন ভাস্কর্য সরানোর বিষয়টি সামনে আসছে ?
সেমিনারে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি ভাস্কর্যটি অন্যত্র প্রতিস্থাপনের পক্ষে মত দেন। তাঁর বক্তব্য, ভাস্কর্য সরানো মানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সরিয়ে ফেলা নয়; বরং যানজট নিরসনের প্রয়োজনে এটি অন্য জায়গায় স্থাপন করা যেতে পারে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর আলম মিয়া নাগরিক স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, দুই নম্বর রেলগেটের জায়গা আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। রেলের জায়গায় থাকা একটি হোটেল ও রাজনৈতিক কার্যালয়ের অংশবিশেষ সরিয়ে জায়গা সম্প্রসারণের পর সেখানেই ভাস্কর্যটি সুন্দরভাবে স্থাপনের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এতে আপাতত একটি বিষয় পরিষ্কার—ভাস্কর্যটি পুরোপুরি অপসারণ নয়, বরং স্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনাই আলোচনায় রয়েছে।
কিন্তু নগরবাসীর প্রশ্ন অন্য জায়গায়।
দুই নম্বর রেলগেটের যানজট যদি মূল সমস্যা হয়, তাহলে প্রথমে কি বাসস্ট্যান্ড, সড়ক দখল, ফুটপাত দখল ও এলোমেলো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয় ?
শুধু একটি স্থাপনা সরিয়ে দিলে যদি একই জায়গায় বাস দাঁড়ানো, যাত্রী ওঠানামা কিংবা সড়ক দখলের পুরোনো চিত্র থেকে যায়, তাহলে যানজট কতটা কমবে—সেটিও এখন ভাবার বিষয়।
নগরবাসীর দাবি, দুই নম্বর রেলগেটকে যানজটমুক্ত করতে হলে সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সেখানে কোন যান কোথায় দাঁড়াবে, বাসের নির্ধারিত স্ট্যান্ড কোথায় হবে, ফুটপাত কীভাবে দখলমুক্ত করা হবে এবং সড়কের জায়গা কারা কীভাবে ব্যবহার করছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত ও নিয়মিত অভিযান জরুরি।
একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য থাকবে কি থাকবে না—এটি অবশ্যই আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু নগরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগের মূল কারণগুলো পাশ কাটিয়ে শুধু ভাস্কর্যকে যানজটের কারণ হিসেবে সামনে আনা হলে তাতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
দুই নম্বর রেলগেটের সংকট তাই এখন শুধু একটি ভাস্কর্য সরানোর বিতর্ক নয়। এটি সড়ক ব্যবস্থাপনা, দখলমুক্ত নগর, অবৈধ বাসস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে।
নগরবাসী দেখতে চান—শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্য সরানো হবে, নাকি একই সঙ্গে সরানো হবে দীর্ঘদিনের দখল, অব্যবস্থাপনা ও যানজটের উৎসগুলোও ?









Discussion about this post