নারায়ণগঞ্জে মাদক ব্যবসায়ীদের ফোনালাপে পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ।
প্রশ্ন উঠছে—কার ছত্রচ্ছায়ায় চলছে মাদক ব্যবসা ? অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে তো ?
নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। দুই কথিত মাদক ব্যবসায়ীর একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযোগ উঠেছে—মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালাতে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দেওয়া হয়েছে।
ভাইরাল ওই ফোনালাপে গ্রেপ্তার হওয়ার পর টাকা দিয়ে ছাড়া পাওয়া, পুলিশের নির্দিষ্ট সদস্যদের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়া এবং কথিত ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে শোনা যায়। এমনকি কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে তাদের কত টাকা দেওয়া হয়েছে, সে দাবিও করা হয়েছে।
ফোনালাপটি নগরীর ইসদাইর এলাকার মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত আব্দুর রাজ্জাক ও আয়েশার মধ্যে।
অভিযোগের গুরুত্ব এখানেই, তাহলে প্রশ্ন শুধু কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের নয়; বরং মাদক ব্যবসার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো অংশের যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
‘৫০ হাজার’, ‘৪ লাখ’, ‘৬ লাখ’—ভাইরাল ফোনালাপে টাকার হিসাব
ফোনালাপে আয়েশা দাবি করেন, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান তার কাছ থেকে সম্প্রতি ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। তার সঙ্গে নিজের ‘ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে বলেও কথোপকথনে দাবি করতে শোনা যায় তাকে।
এ ছাড়া আতিক ও রুবেল নামে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তাকে আটক করে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৪ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
আর ফতুল্লা মডেল থানার এসআই নন্দন চন্দ্র সরকার ও মো. রফিকের বিরুদ্ধে ৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে ওই ফোনালাপে।
অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। কারণ যাদের কাজ মাদক ব্যবসা বন্ধ করা, তাদেরই কারও বিরুদ্ধে যদি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে পুরো মাদকবিরোধী অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতা।
পুলিশের অভিযান, গুলির ঘটনা—তারপরই বিস্ফোরক ফোনালাপ
সম্প্রতি ইসদাইর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যে পুলিশ গেলে গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের পাল্টা গুলিতে জসিম ও তার সহযোগী মোহন আহত হন এবং পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ঘটনায় আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর পরপরই রাজ্জাক ও আয়েশার কথিত ফোনালাপ সামনে আসে।
এদিকে রাজ্জাক ও তার ছেলে ওয়াসিম আত্মগোপনে রয়েছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে।
এখন প্রশ্ন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কাছে
ভাইরাল ফোনালাপে যেসব পুলিশ সদস্যের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা কী বলবেন ?
অভিযোগ অস্বীকার করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত।
কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়ে থাকলে সেটিও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া দরকার। আর অভিযোগ সত্য হলে—পুলিশের পোশাক পরে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিও জনসম্মুখে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কারণ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করার দায়িত্ব যার, সেই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে?
মাদক ব্যবসায়ী আর অসাধু পুলিশ সদস্যের যোগসাজশ যদি সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে এটি শুধু একটি থানার বা কয়েকজন কর্মকর্তার সমস্যা নয়—এটি নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অডিওটি তাদের নজরে এসেছে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়—‘টাকা দিয়ে পুলিশ ম্যানেজ’ কথিত এই ফোনালাপ কি কেবল মাদক ব্যবসায়ীদের বানানো গল্প হিসেবে প্রমাণিত হবে, নাকি তদন্তে বেরিয়ে আসবে নারায়ণগঞ্জের মাদক সাম্রাজ্যের আড়ালে থাকা আরও ভয়ংকর কোনো যোগসাজশ ?
উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এখন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের।









Discussion about this post