নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির আগে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পোশাক রপ্তানি খাতে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। কারখানা থেকে কোনো পণ্য বের হয়নি, নির্ধারিত ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) কোনো চালান পৌঁছেনি, এমনকি চট্টগ্রাম বন্দরেও পণ্যের অস্তিত্ব নেই—তারপরও কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে পণ্য রপ্তানি হয়ে গেছে!
নারায়ণগঞ্জের আরটি ফ্যাশনকে ঘিরে এমন একটি ‘ভূতুড়ে রপ্তানি’র ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে সামনে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র।
শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠানের ১২২টি চালানে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কাস্টমস কর্মকর্তা, আইসিডি কর্তৃপক্ষ ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে ২৯টি চালানকে ভুয়া রপ্তানি হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে, যার ঘোষিত মূল্য প্রায় ২৪ কোটি টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, জাল কাগজপত্র, কাস্টমস কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর নকল এবং অনলাইন কাস্টমস ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসব চালানকে বৈধ রপ্তানি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পণ্য নেই, তবু রপ্তানি !
গত ২৪ মে আরটি ফ্যাশন সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডের মাধ্যমে প্রায় ৮৪ লাখ টাকা মূল্যের ২৩ হাজার ৯৯২ কেজি পোশাক রপ্তানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু ঘোষণার পরও নারায়ণগঞ্জের কারখানা থেকে কোনো পণ্য নির্ধারিত আইসিডিতে যায়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরেও ওই চালানের কোনো পণ্য পৌঁছানোর তথ্য নেই। অথচ কাস্টমসের নথিতে সেটিকে রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র পাওয়া চালান হিসেবে দেখানো হয়।
এমনকি চালানটির মোট ওজন ও নিট ওজন একই দেখানোয় কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ তৈরি হয়। সাধারণত পণ্যের সঙ্গে প্যাকেজিংয়ের ওজন যুক্ত হওয়ায় মোট ওজন ও নিট ওজন এক হওয়ার কথা নয়।
অভিযোগ রয়েছে, ঈদের ছুটির আগে জাহাজে পণ্য তোলার শেষ সময়ের ব্যস্ততাকে কাজে লাগিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে চালানটি ছাড় করা হয়।
কাস্টমস কর্মকর্তার সিল-স্বাক্ষরও জাল
আরটি ফ্যাশনের চালান ছাড়ের কাগজে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তানজিনা জান্নাত আইভিসহ চার কাস্টমস কর্মকর্তার সিল ও স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ উঠেছে।
তানজিনা জান্নাত আইভির ভাষ্য অনুযায়ী, আরটি ফ্যাশনের চালানসহ অন্তত চারটি চালানে তাঁর ও সহকর্মীদের সিল-স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে।
ছুটির পর কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখতে পান, চালানটি এরই মধ্যে রপ্তানি হয়েছে বলে সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে।
ডিপোর দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার শুভ্র দেব মন্ডলের ভাষ্য, পণ্য জাহাজে তোলার শেষ দিনে কাগজপত্র জমা দিয়ে প্রতারকরা জনবল সংকট ও কর্মকর্তাদের ওপর থাকা অতিরিক্ত কাজের চাপের সুযোগ নিয়েছে।
সাত প্রতিষ্ঠানের ২৯ ‘ভূতুড়ে’ চালান
অনুসন্ধানে ভুয়া রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উঠে এসেছে আরটি ফ্যাশন, এইচবিএস অ্যাপারেলস, আল গালেব ফ্যাশন, ডিলাক্স অ্যাপারেলস, এনএম ফ্যাশন, এনএম নিট ফ্যাশন ও ভূঁইয়া ফেব্রিকস-এর নাম।
ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংয়ে এসব পণ্য রপ্তানির কথা দেখানো হলেও নির্ধারিত আইসিডিতে পণ্য প্রবেশের তথ্য নেই।
২৯টি চালানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল তিনটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে—শাহজালাল এন্টারপ্রাইজ, আলফা টেক্সটাইল ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্সি। চালানগুলো প্রক্রিয়া করা হয় সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট ও পোর্ট লিংক লজিস্টিকস সেন্টার নামের দুটি বেসরকারি আইসিডির মাধ্যমে।
বন্ডেড সুবিধার আড়ালে বড় কারসাজি ?
কাস্টমস সংশ্লিষ্টদের মতে, এই জালিয়াতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার। রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো শুল্ক ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পায়। শর্ত হলো, সেই কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে হবে।
অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য বিদেশে না পাঠিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেছে। এরপর কাগজে-কলমে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে সেই কাঁচামালের হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেছে।
বন্ডেড পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলে পণ্যভেদে ৮৯ থেকে ১৫৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর দিতে হয়। ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে সেই বিপুল অর্থ এড়ানোর পাশাপাশি সরকারি রপ্তানি প্রণোদনা নেওয়ারও সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ।
অর্থপাচারের সন্দেহও
কাস্টমস কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিষয়টি শুধু শুল্ক ফাঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমদানির সময় পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে বিদেশে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার পর সেই অর্থের লেনদেনকে বৈধ দেখাতেও ভুয়া রপ্তানি নথি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে।
একজন কাস্টমস কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এখন পর্যন্ত যে ভুয়া রপ্তানির ঘটনা ধরা পড়েছে, তা বড় কোনো চক্রের কেবল একটি অংশও হতে পারে।
পুরোনো কৌশল, নতুন চেহারা
ভুয়া রপ্তানির এই কৌশল অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও চট্টগ্রাম বন্দরের কাস্টমস ব্যবস্থায় ‘ভূতুড়ে রপ্তানি’র ঘটনা ধরা পড়েছে। আগের তদন্তে অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানের শতাধিক ভুয়া চালানের মাধ্যমে সরকারি প্রণোদনা নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল।
এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে। তদন্তে রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া যায়। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে ওই মামলায় ১১ জন কাস্টমস কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর তথ্যও সামনে এসেছে।
তবু পুরোনো ঘটনার পর নতুন করে একই ধরনের জালিয়াতি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে—ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কি এখনো রয়ে গেছে?
রপ্তানি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
ভুয়া রপ্তানির পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার রপ্তানি তথ্যের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সিপিডির গবেষণায়ও সরকারি রপ্তানি তথ্যের মধ্যে বড় পার্থক্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেও দুই সংস্থার রপ্তানি তথ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান রয়েছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, কিছু স্বাভাবিক কারণে তথ্যের পার্থক্য হতে পারে; কিন্তু প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান অস্বাভাবিক এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
দায় কার?
প্রশ্ন উঠেছে, পণ্য কারখানা থেকে বের না হলে আইসিডির কাগজে তা এল কীভাবে? আইসিডিতে পণ্য না ঢুকলেও কাস্টমসের নথিতে রপ্তানি সম্পন্ন দেখানো হলো কীভাবে? কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর জাল হওয়ার পরও সিস্টেমে চালানটি রপ্তানি হিসেবে নথিভুক্ত হলো কীভাবে?
আরও বড় প্রশ্ন—এই পুরো প্রক্রিয়ায় শুধু রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট দায়ী, নাকি কাস্টমস ও আইসিডির ভেতরেও কোনো অসাধু চক্র সক্রিয়?
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার আবুল বাশার মো. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, বছরের প্রথম ছয় মাসের রপ্তানি নথি যাচাই করা হচ্ছে। দুটি বেসরকারি আইসিডিতে ভুয়া রপ্তানির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং অন্য ডিপোগুলোতেও তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো চিত্র স্পষ্ট হবে না।
নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাক কারখানা থেকে শুরু হওয়া এই ঘটনা এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির অভিযোগ নয়; বরং প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যবস্থার নিরাপত্তা, কাস্টমসের নজরদারি এবং বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ে।
পণ্য ছাড়াই যদি কোটি কোটি টাকার রপ্তানি কাগজে সম্পন্ন হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন একটাই—দেশের রপ্তানি ব্যবস্থায় ‘ভূতুড়ে চালান’ ঠেকানোর পাহারাদারই বা কোথায় ?









Discussion about this post