নতুন এসপি হাবিবুর রহমান; প্রশ্নের মুখে ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’, তদবির ও নয় মাসের পুলিশ প্রশাসন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলির আদেশ পাওয়ার ১৮ দিনের মাথায় অবশেষে বিদায় নিতে হচ্ছে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীকে। গত ১২ আগস্ট তাকে হাইওয়ে পুলিশে বদলি করা হলেও নতুন পুলিশ সুপার নিয়োগ না হওয়ায় তিনি এতদিন নারায়ণগঞ্জেই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
এবার তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানকে নারায়ণগঞ্জের নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে বদলি করেছে সরকার।
আজ রোববার (৩০ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ রদবদলের তথ্য জানানো হয়।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানকে নারায়ণগঞ্জে বদলি করা হয়েছে এবং পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহীকে মাদারীপুরের এসপি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগে গত ১২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে মিজানুর রহমান মুন্সীকে হাইওয়ে পুলিশে বদলি করা হয়। তিনি গত বছরের ২৯ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় নয় মাসের মাথায় তার বদলির আদেশ আসে।
বদলির আদেশের পরও ‘নারায়ণগঞ্জমুখী’ তদবিরের অভিযোগ
বদলির আদেশ জারির পরও মিজানুর রহমান মুন্সীর নারায়ণগঞ্জে থেকে যাওয়ার চেষ্টা নিয়ে প্রশাসনিক ও পুলিশ মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, হাইওয়ে পুলিশে বদলির আদেশ পাওয়ার পরও নারায়ণগঞ্জে আরও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালানো হয়।
তবে এ তদবিরের বিষয়ে মিজানুর রহমান মুন্সীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—১২ আগস্ট বদলির আদেশ হওয়ার পরও কেন নতুন এসপি নিয়োগ দিতে ১৮ দিন সময় লাগল এবং এই সময়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হয়েছে?
‘ক্যাশিয়ার’ বিতর্ক: কার হাতে ছিল থানার আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ?
মিজানুর রহমান মুন্সীর সংক্ষিপ্ত দায়িত্বকাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হচ্ছে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে কথিত কুমিল্লা বলয় তৈরি করে ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ গড়ে ওঠার অভিযোগ।
পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য, কয়েকজন ওসি এবং মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছিল।
ওই বলয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদবির, মামলা-সংক্রান্ত সুবিধা, আটক ও ছাড়, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং থানাকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তবে অভিযোগের ব্যাপকতা এবং পুলিশের অভ্যন্তরেই এ নিয়ে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—কারা ছিলেন এই কথিত ‘ক্যাশিয়ার’, তাদের দায়িত্ব কী ছিল এবং কার স্বার্থে তারা কাজ করতেন?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মিজানুর রহমান মুন্সীর দায়িত্বকালীন সময়ে বিভিন্ন থানার অভিযোগ, আটক-সংক্রান্ত ঘটনা, অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো পৃথকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন, প্রচারের মঞ্চে ‘সাফল্যের গল্প’?
মিজানুর রহমান মুন্সীর দায়িত্বকালে নারায়ণগঞ্জে হত্যা, ছিনতাই, মাদক, কিশোর গ্যাং, সড়ক দুর্ঘটনা ও সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। জেলা পুলিশ বিভিন্ন সময়ে অভিযান ও গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল।
একদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ অভিযান, মাদকবিরোধী কার্যক্রম ও কিশোর গ্যাং দমনে সাফল্যের দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ—অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে থানাকেন্দ্রিক প্রভাবশালী মহল, দালালচক্র এবং বিভিন্ন তদবিরবাজদের দৌরাত্ম্য নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে।
সমালোচকদের ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ‘সাফল্যের প্রচার’।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—পুলিশের প্রকৃত সাফল্য কতটা এবং প্রচারণার সাফল্য কতটা?
‘গুণকীর্তন বাহিনী’ কার স্বার্থে ?
মিজানুর রহমান মুন্সীকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকজন ব্যক্তি নিয়মিত তার পক্ষে প্রচার চালাতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। পুলিশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার কার্যক্রমকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, পুলিশ প্রশাসনের প্রধানের ভাবমূর্তি রক্ষায় কেন বাইরের অনানুষ্ঠানিক একটি বলয় সক্রিয় থাকবে ?
আরও গুরুতর প্রশ্ন হচ্ছে, এসব ব্যক্তি কি কেবল স্বেচ্ছায় প্রচার চালিয়েছেন, নাকি পুলিশ প্রশাসনের ভেতরের কোনো অংশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও স্বার্থের সম্পর্ক ছিল ?
এই অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নয় মাসের হিসাব চায় নারায়ণগঞ্জ
নতুন এসপি আসার আগে মিজানুর রহমান মুন্সীর দায়িত্বকালের একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে তার সময়ে—
- কোন কোন থানার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে;
- কোন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল;
- এসব অভিযোগের কতটির তদন্ত হয়েছে;
- কথিত ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ নিয়ে কোনো অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান হয়েছে কি না;
- দালাল ও তদবিরবাজদের প্রভাব কতটা ছিল;
- এবং বদলির পরও নারায়ণগঞ্জে থেকে যাওয়ার তদবিরের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—
এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও শিল্পাঞ্চলঘন একটি জেলায় পুলিশ প্রশাসনকে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয় বা অনানুষ্ঠানিক প্রভাবের কেন্দ্র হতে দেওয়া যায় না। পুলিশ সুপারের কার্যালয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান—কোনো কর্মকর্তার ‘নিজস্ব দরবার’ নয়।
নতুন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ শুধু দায়িত্ব গ্রহণ নয়; বরং প্রশাসনের ভেতরে কোনো অনিয়ম, সিন্ডিকেট, দালালচক্র বা কথিত আর্থিক বলয় থেকে থাকলে তা চিহ্নিত করে ভেঙে দেওয়া।
মিজানুর রহমান মুন্সীর বিদায়ের সঙ্গে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হচ্ছে। কিন্তু নয় মাসের সেই অধ্যায়ের প্রশ্নগুলো এখনো খোলা—আর নারায়ণগঞ্জবাসী উত্তর চায়।
[প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মিজানুর রহমান মুন্সী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে সংযুক্ত করা হবে। এমন অভিযোগ সম্পর্কে বিগত সময়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য চেয়ে ফোনে এবং ম্যাসেজের মাধ্যমে বারবার তথ্য যাওয়া হলেও কোন কর্মকর্তাই এমন অভিযোগের বিষয়ে তথ্য প্রদান করেন নাই]









Discussion about this post