দশম শ্রেণির তুচ্ছ দ্বন্দ্বের জেরে বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন
লাশ-মোটরসাইকেল লেকে ফেলে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ সাজানোর চেষ্টা, গ্রেফতার দুই
নিজস্ব প্রতিবেদক, রূপগঞ্জ
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ছয় বন্ধুর মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছিল দ্বন্দ্ব। সময়ের সঙ্গে তারা দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠলেও সেই বিরোধের অবসান হয়নি। বরং পুরোনো ক্ষোভ ও পূর্বশত্রুতার জের ধরে পাঁচ বন্ধু মিলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে তাদেরই সহপাঠী ও বন্ধু মেহেদী হাসান দিগন্তকে (১৮)—এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
হত্যার পর ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়। এজন্য দিগন্তের মরদেহ মোটরসাইকেলসহ পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কের ভূইয়াবাড়ি ব্রিজের নিচে লেকের পানিতে ফেলে রাখা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে ব্রিজের নিচে পানির মধ্যে গাদার নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও পুলিশের দাবি।
গত ২৮ আগস্ট রাতে রূপগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্বাচল ৭ নম্বর সেক্টরের আলমপুর এলাকায় ভূইয়া ব্রিজের নিচে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার তদন্তে নেমে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতের দুই বন্ধু তুহিন ও আব্দুল্লাহকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য তিনজনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে রূপগঞ্জ থানায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাহউদ্দিন।
পুলিশ জানায়, নিহত মেহেদী হাসান দিগন্ত গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে। দিগন্তসহ অভিযুক্ত পাঁচজন গাজীপুর বোর্ড ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে একই শ্রেণির সহপাঠী ছিল। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ছয় বন্ধুর মধ্যে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। সেই পুরোনো দ্বন্দ্বের জেরই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়ায় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
ওসি এএইচএম সালাহউদ্দিন জানান, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৮ আগস্ট রাতে দিগন্তকে পূর্বাচলের ভূইয়া ব্রিজ এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। একপর্যায়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পর নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে অভিযুক্তরা নতুন পরিকল্পনা করে। ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে প্রচার করার উদ্দেশ্যে দিগন্তের মরদেহ মোটরসাইকেলসহ ব্রিজের নিচে লেকের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে তা পানির মধ্যে গাদার নিচে লুকিয়ে রাখা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে নিহতের বন্ধু তুহিন ও আব্দুল্লাহকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় এবং মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ঘটনায় নিহত দিগন্তের বড় ভাই শান্ত ইসলাম রাব্বি বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
একসময় যে বন্ধুরা একই বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করেছে, একসঙ্গে সময় কাটিয়েছে, সেই বন্ধুত্বের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল পুরোনো বিরোধের আগুন।
মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণের জীবন কেড়ে নেওয়ার এমন অভিযোগে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আর তুচ্ছ এক বিরোধের জের ধরে বন্ধুর হাতে বন্ধুর এমন করুণ মৃত্যুতে এলাকায়ও সৃষ্টি হয়েছে গভীর শোক ও চাঞ্চল্য।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।









Discussion about this post