কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না !
ভূমি অফিসে অনুপস্থিত কর্মকর্তা, হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষর—আকস্মিক পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রীর অসন্তোষ
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না’—বাংলার বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটি যেন আবারও বাস্তব হয়ে উঠল নারায়ণগঞ্জের ভূমি অফিসে। দপ্তর বদলেছে, সেবার ধরন আধুনিক হয়েছে, ডিজিটালাইজেশনের কথাও বলা হচ্ছে; কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের পুরোনো অভ্যাস বদলায়নি। সময়মতো অফিসে না এসেও হাজিরা খাতায় আগেভাগেই স্বাক্ষর দিয়ে রাখার অভিযোগের চিত্র ধরা পড়েছে খোদ ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর খানপুর এলাকায় তিনটি সার্কেলের ভূমি কমিশনারের কার্যালয় আকস্মিক পরিদর্শন করেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
পরিদর্শনে গিয়ে দুটি সার্কেল অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিত দেখতে পান তিনি।
অথচ হাজিরা খাতা খুলে দেখা যায়, উপস্থিত না থাকলেও অনেকের স্বাক্ষর আগেই দেয়া রয়েছে। অর্থাৎ মানুষ অফিসে আসার আগেই হাজিরা যেন অফিসে এসে গেছে !
বিষয়টি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত না থাকলেও অনেকের হাজিরা দেয়া হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেবার মান উন্নয়নে সরকারের নানা উদ্যোগের মধ্যেও যদি দায়িত্বপ্রাপ্তরাই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে কীভাবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সকালে অফিসে না এসেও হাজিরা নিশ্চিত করার এই সংস্কৃতি নতুন নয় বলেই অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে। কাগজে-কলমে নিয়ম, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার কথা থাকলেও বাস্তবে পুরোনো অভ্যাসের পরিবর্তন না হলে শুধু নির্দেশনা দিয়ে কতটা পরিবর্তন আনা সম্ভব—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী নিজেও শুধু শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অনিয়মের বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, সরকারি সেবায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।’
পরিদর্শনকালে অফিসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, কয়েকজন নারী কর্মকর্তা একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও বিচারিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভূমি প্রশাসন মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সরকারি সেবাগুলোর একটি। জমির নামজারি, খতিয়ান, রেকর্ড সংশোধনসহ নানা কাজে প্রতিদিন মানুষকে ভূমি অফিসের দ্বারস্থ হতে হয়। সেখানে দায়িত্বশীলদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যেখানে মৌলিক শর্ত, সেখানে আগাম হাজিরা দিয়ে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
এখন দেখার বিষয়, প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে ধরা পড়া এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা নেয়া হয়, নাকি সত্যিই বদলায় পুরোনো কর্মসংস্কৃতি।
কারণ, কয়লা যতই ধোয়া হোক, ময়লা না গেলে শুধু ধোয়ার আয়োজনেই বা লাভ কী?








Discussion about this post